ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে যাচ্ছে দেশ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পাস হওয়ার পর নিজ শহর চট্টগ্রাম সফরে এসে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশ তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে বিগত আওয়ামী সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম সফরের সময় শাহ আমানত বিমানবন্দরে গণমাধ্যমে এসব কথা বলেন। তার আগমন উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী বিমানবন্দরে উপস্থিত হন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বিমানবন্দরে অর্থমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এর আগে বিমানবন্দরে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভা করেন মন্ত্রী।

বিমানবন্দরের বাইরে জাতীয় বাজেট ও দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ, সরাসরি বিনিয়োগ, ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগ এবং ফান্ড ম্যানেজারদের বিনিয়োগ সবই বাংলাদেশে আসছে। বাজেট প্রথমত বাংলাদেশের জন্য। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের যে সম্ভাবনা আছে, সেটিকে মাথায় রেখে বাজেট করা হয়েছে এবং সেই সম্ভাবনাগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামকে লজিস্টিক্যাল হাব হিসেবে হড়ে তোলা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এবারের বাজেটে এ পরিকল্পনার প্রতিফলন রয়েছে। তিনি বলেন, কেবল সমুদ্রবন্দরের কারণে নয়, চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানও রয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে সরকারের পরিকল্পনায় অনেক কিছু আনা হয়েছে। নদীর ওপারে আনোয়ারায় ৬০০ একর জমিতে একটি ফ্রি ট্রেড জোন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দর নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে কার্গো হাব ও প্যাসেঞ্জার হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক জোন হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে লাকসাম অংশের উন্নয়নের মাধ্যমে ট্রেনে যাতায়াতের সময় দুই ঘণ্টা কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও বাজেটে রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে বন্দরগুলো আরও বেশি পরিমাণে কাজ করতে পারবে। অন্যদিকে মাতারবাড়ীকে ঘিরেও বড় ধরনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক্যাল সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রেখেই বাজেটে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের বিষয় উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন,  এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন একটি কঠিন কাজ। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। আগে এই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। এরপর সম্ভাবনার জায়গাগুলো কাজে লাগানো হবে।

চেম্বার নেতাদের মতবিনিময় : গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ব্যবসায়ী সমাজ ও চিটগাং চেম্বার পরিচালকম-লীর পক্ষে সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এবং বিমানবন্দরে একটি লাউঞ্জে মন্ত্রীর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীতে প্রথমবারের মতো এমন একটি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রদানের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে অভিনন্দন জানান। তিনি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়ন্ত্রণকরণ, ব্যবসার খরচ হ্রাস ও সহজীকরণের নীতিমালা প্রণয়নের জন্য সর্বস্তরের ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বাণিজ্যিক রাজধানীর গুরুত্বকে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। চট্টগ্রামে বিনিয়োগ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিনির্মাণ হবে উল্লেখ করে বৃহত্তর চট্টগ্রামের শিল্পায়ন বৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে কর্ডলাইন, এক্সপ্রেসওয়ে, বে-টার্মিনাল, আনোয়ারার নিকটবর্তী অঞ্চল ও মাতারবাড়ীতে ফ্রি ট্রেড জোন নির্মাণের সিদ্ধান্ত, আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প, চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প, চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন প্রকল্প, কক্সবাজারের রামুতে ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প, আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের পাশাপাশি এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান চেম্বার সভাপতি।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গুরুত্বসহকারে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতাদের কথা শোনেন এবং দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশসহ সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে টেকসই করে গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ সময় অন্যদের মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ এমপি, আবু সুফিয়ান এমপি, এনামুল হক এনাম এমপি, সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. বেলায়েত হোসেন, কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সেলিম রহমান, এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এম ছালাম, ইস্পাহানী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা সালমান ইস্পাহানী, ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী, চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস এম সাইফুল আলম, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন, বিএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলী হুসেইন আকবর আলী, আবুল খায়ের গ্রুপের ডিএমডি আবু সাঈদ চৌধুরী, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের লিয়াকত আলী চৌধুরী, বিএসএম গ্রুপের আবুল বাশার চৌধুরী, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালামসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী নেতা উপস্থিত ছিলেন।