বিশ্বকাপের স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চলা তীব্র বিতর্কের মুখে অবশেষে মুখ খুলেছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের আইনি চাপ এবং ট্রাম্পের সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস' তুলেছিল, সোমবার রাতে আলাদা দুটি বিবৃতিতে তার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন এই দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, তবে দুজনেই দাবি করেছেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি ফিফার নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে।
সোমবার ওভাল অফিসের এক অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, তিনি গত সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারায় বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সরাসরি ফোন করেছিলেন। তবে ট্রাম্পের দাবি, তিনি ফিফার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। ট্রাম্প বলেন:
"আমি কেবল বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য বলেছিলাম। আমি ইনফান্তিনোকে বলিনি যে—আপনাকে এটি করতেই হবে। আমি শুধু একবার দ্বিতীয়বার চোখ বুলাতে অনুরোধ করেছিলাম। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ফিফায় নিয়েছে।"
‘লাল কার্ড কী প্রথমে জানতামই না’
খেলাধুলা "খুব ভালো বোঝেন" দাবি করলেও ট্রাম্প খোলামেলা স্বীকার করেন যে, শুরুতে তিনি 'লাল কার্ড' কী বা এর পরিণতি কী হতে পারে তা জানতেন না। যখন তিনি জানতে পারেন যে এর কারণে টুর্নামেন্টে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৩ গোল) বালোগুন সোমবার রাতে সিয়াটলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ নকআউট ম্যাচে খেলতে পারবেন না, তখনই তিনি হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেন।
রেফারির সেই সিদ্ধান্তকে "ভয়াবহ" আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প ভিএআর প্রযুক্তিরও সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, স্লো-মোশন রিপ্লেতে সাধারণ একটি সংঘর্ষকেও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক দেখায়। ট্রাম্প বলেন, 'আমার মনে হয়নি ওটা কোনো ফাউল ছিল। দুজন দুর্দান্ত অ্যাথলেট জাস্ট একে অপরের সাথে ধাক্কা খেয়ে জড়িয়ে পড়েছিল। বালোগুনকে ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যদি হেরে যেত, তবে তা পুরো টুর্নামেন্টের গায়ে একটা দাগ হয়ে থাকত।' নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় ফিফাকে একটি "চমৎকার ও বুদ্ধিদীপ্ত" সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রশংসাও করেন তিনি।
আইনি প্রক্রিয়া মেনেই সিদ্ধান্ত, দাবি ইনফান্তিনোর
অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ফিফার পক্ষপাতিত্ব ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গের যে তীব্র সমালোচনা চলছে, তার জবাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (টুইটার) একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন:
"আমাদের কথোপকথনের সময় আমি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিলাম যে, এটি ফিফার স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সংস্থাগুলোর একটি চলমান আইনি প্রক্রিয়া। এবং এই বিষয়ে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যথাযথ নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্ট যোগ্য সংস্থাই গ্রহণ করবে। ফিফার শাসন ব্যবস্থা এভাবেই কাজ করে এবং এই নীতি আমি সবসময় সমুন্নত রাখব।"
ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি মূলত তাদের ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বালোগুনের লাল কার্ড বহাল রেখেই তাঁর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা ১ বছরের জন্য প্রবেশনে স্থগিত করেছে, যার ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাঁর মাঠে নামার আইনি বাধা কেটে যায়।
ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় ও বেলজিয়ামের আইনি লড়াই
ট্রাম্পের এই সাফাই ও ফিফার ‘ইউ-টার্ন’কে ফুটবল বিশ্বের কেউ ভালো চোখে দেখছে না। ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফা সোমবার কড়া ভাষায় এক বিবৃতিতে বলেছে, 'ফিফা সমস্ত সীমা পার করে গেছে। যখন নিয়ম রক্ষাকারীরাই নিয়মের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন প্রতিযোগিতার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।' সাবেক লিভারপুল বস ইয়ুর্গেন ক্লপ একে "পাগলামি" বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং সাবেক ফিফা প্রধান সেপ ব্ল্যাটার বলেছেন, 'রাজনৈতিক ফোনালাপে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত বদলায় না।'
এদিকে ফিফার এই সিদ্ধান্তে স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন । তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত সহ সম্ভাব্য সব আইনি পথ খতিয়ে দেখছে এবং সোমবার রাতের ম্যাচে বালোগুনের খেলার যোগ্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।