দেশের চার জেলায় পৃথক ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত। এর মধ্যে জামালপুরের গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৭ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড, একজন খালাস দেওয়া হয়েছে। নোয়াখালীতে পাঁচ বছরের শিশু আসমা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় একমাত্র আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। খাগড়াছড়ির রামগড়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং গোপালগঞ্জে স্কুল শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় ধর্ষকসহ দুই আসামির যাবজ্জীনের রায় হয়েছে। গতকাল সোমবার সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালগুলো অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে এই রায় ঘোষণা করে। দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন
জামালপুর : জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৭ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে খালাস দিয়েছে বিজ্ঞ আদালত। এ ছাড়া প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর ৩টায় জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, রাশেদুর রহমান ওরফে পাপ্পু (৩০), বিজু মিয়া (৩৬), বাদশা মিয়া (৩৫), জুয়েল মিয়া (৩৫), আশরাফুল ইসলাম (৪০), জসিম উদ্দিন ও আছমত আলী। অন্যদিকে, ইদ্রিস আলী নামের একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ফজলুল হক জানান, ২০২৫ সালের ২৫ মে রাতে আসামিরা বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষীয়া এলাকায় এক গৃহবধূকে অপহরণ করে একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। পরে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে বকশীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় ৯ জন সাক্ষীর মধ্যে সাতজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে। এদিকে, ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাকে খালাস দিয়েছে।
নোয়াখালী : নোয়াখালীর চাটখিলে পাঁচ বছরের শিশু আসমা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় একমাত্র আসামি শাহাদাতের (২৬) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে নোয়াখালী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফারজানা আক্তার এই রায় ঘোষণা করেন।
নিহত আসমা উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নের মেঘা গ্রামের মৃধা বাড়ির বাসিন্দা মাওলানা শাহজাহানের মেয়ে। মামলার একমাত্র আসামি শাহাদাত (২৬) একই গ্রামের বাবুল হোসেনের ছেলে।
মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৪ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় আসমা। ঘটনার ৯ দিন পর বাড়ির পেছনের সেপটিক ট্যাংকি থেকে আসামির তথ্যের ভিত্তিতে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় শাহাদাতকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত চলাকালে শাহাদাত আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত একটি ঘরে নিয়ে আসমাকে ধর্ষণ করে শাহাদাত। ধর্ষণের পর ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়ার আশঙ্কায় সে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে এবং লাশ সেপটিক ট্যাংকিতে ফেলে রাখে।
খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়ির রামগড়ে দ্বিতীয় শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের মামলায় আসামি মো. শাহিনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল সোমবার দুপুরে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শায়েলা শারমিন এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এটিই প্রথম মামলার রায়। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনার মাত্র ১১ মাস ১৪ দিনের মাথায় এ মামলার রায় দেওয়া হলো। মামলা চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করে আদালত এই সিদ্ধান্ত নেয়।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ভিকটিম রামগড়ের নাকাপা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ঘটনার দিন দুপুরে মাদ্রাসা ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে নাকাপা বাজারস্থ ‘মিম হোটেল’ নামক দোকানের সামনে পৌঁছালে দোকানদার মো. শাহিন তাকে ডেকে ভেতরে নিয়ে যান। আসামি পূর্ব পরিচিত ও স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় সম্পর্ক সূত্রে ‘নাতিন’ ডেকে প্রথমে তাকে দোকানে বসিয়ে বিস্কুট ও কেক খেতে দেন।
দোকান থেকে বের হতে দেরি হওয়ায় ভিকটিমের সহপাঠীরা তাকে রেখে চলে যায়। পরে দোকানে কোনো ক্রেতা বা লোকজনের উপস্থিতি না থাকার সুযোগে, আসামি শাহিন ভিকটিমকে দোকানের পেছনের অংশে বেড়ার আড়ালে নিয়ে ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এই ঘটনায় রামগড় থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯ (১) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট বেদারুল ইসলাম এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় এক নারীসহ দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে গোপালগঞ্জ শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মোরশেদ আলম এ রায় প্রদান করেন।
মামলার বিবরণে জানা গেছে, কাশিয়ানী উপজেলার তিলছড়া গ্রামের উজ্জ্বল বিশ্বাস অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সংগীতা টিকাদারকে বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব দিয়ে উক্ত্যক্ত করত। কিন্তু ‘সে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ২০২০ সালের ০৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় অন্য আসামি কল্পনা বিশ্বাস পিঠা বানানোর লোভ দিয়ে সংগীতাকে ডেকে ঘরের মধ্যে নিয়ে যায়।
এ সময় অন্য আসামি উজ্জ্বল বিশ্বাস জোর করে সংগীতাকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় ওই বছরের ১০ অক্টোবর কাশিয়ানী থানায় ধর্ষিতার মা অনিতা টিকাদার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
পরে তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রদান শেষে আদালত উজ্জ্বল বিশ্বাসকে যাবজ্জীবন ও এক লাখ টাকা এবং অন্য আসামি কল্পনা বিশ্বাসকে যাবজ্জীবন ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. কদরে আলম খান বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।