নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নিয়োগেই গলদ

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০২:০৭ এএম

উৎপাদন থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। বয়স প্রায় এক যুগ  হতে চলল। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ পদে অর্থাৎ চেয়ারম্যান হিসেবে ছয়জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। নতুন আরেকজন আছেন যোগদানের অপেক্ষায়। তবে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম থেকে এখন পর্যন্ত আইন মেনে কোনো চেয়ারম্যানকেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সর্বোচ্চ পদে নিয়োগে এমন অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের লক্ষ্য পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিএফএসএর চেয়ারম্যান হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু/কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামকে পদায়ন করে গত ২৬ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রকল্পে নিজস্ব ব্যস্ততার কারণে দুই মাস পেরিয়ে গেলে সেতু নির্মাণে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই কর্মকর্তা নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে পারেননি। তিনি সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের সমস্ত হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দেওয়ার পর যোগদান করবেন বলে জানা গেছে।

শফিকুল ইসলাম ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে সেতু বা কালভার্ট নির্মাণের প্রকল্পটিতে কাজ করছেন। অথচ এখন তাকে এমন এক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যেখানে পদায়নের প্রথম যোগ্যতাই হলো ‘খাদ্য বিষয়ে কমপক্ষে ২৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কোনোভাবেই আইনের এই শর্ত পূরণ করে না।

বিএফএসএর নতুন চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি চলতি সপ্তাহের মধ্যেই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। দুয়েক দিনের মধ্যে তাকে পুরনো কর্মস্থল থেকে রিলিজ দেওয়া হতে পারে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এমন ঘটনা শুধু অনাগত চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে নয়, এই পদে বিগত সময়ে যত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের সবার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।

২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী কর্র্তৃপক্ষ যাত্রা শুরু করে ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। এই আইনে চেয়ারম্যান নিয়োগের যোগ্যতা-অযোগ্যতার শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অথচ প্রতিবারই তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। সাবেক অতিরিক্ত সচিব মুশতাক হাসান মুহ: ইফতিখারকে ২০১৫ সালে প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পড়াশোনা করেছেন এবং বিসিএসের মাধ্যমে অ্যাডমিন ক্যাডারে যোগ দেন। আইনের শর্ত অনুযায়ী খাদ্য বিষয়ে তার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।

দ্বিতীয় চেয়ারম্যান ছিলেন মাহফুজুল হক। তিনি ফুড ক্যাডারের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দিলেও পরে ডিএস পুলের মাধ্যমে অ্যাডমিন ক্যাডারে যান। বিএফএসএর চেয়ারম্যান  হওয়ার আগে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর তিন বছর পর তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা সরওয়ার জাহানকে তৃতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি কর্মজীবনে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম জেলা পষিদের নির্বাহী কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছেন। খাদ্য নিয়ে কাজ করার ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা তারও ছিল না। 

এরপর মাস তিনেক সময়ের জন্য বিএফএসএর সদস্য ও অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব কবীর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পদায়ন করা হয় আরেক অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল কাইউম সরকারকে। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এই দপ্তরের দায়িত্বে এসেছিলেন। এর পরের চেয়ারম্যান হিসেবে আবারও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে এনে দায়িত্ব দেওয়া হয় জাকারিয়াকে। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তা তার দায়িত্বের সময়ে বিএফএসএকে সবচেয়ে বেশি অকার্যকর করে রাখেন। তার সারাজীবনের পড়াশোনা বা কাজের অভিজ্ঞতায় কখনো খাদ্য বিষয়টি ছিল না।

নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের ২০২৩ সালের আইনে ৯ ধারায় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যানের যোগ্যতা হিসেবে যেমন ২৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়েছে, তেমনি চারজন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত। এই চারজনের মধ্যে আইন ও নীতি বিভাগ এবং খাদ্যভোগ ও ভোক্তা অধিকার বিভাগের দুটি পদে প্রায়ই অ্যাডমিন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়োগ পাচ্ছেন। 

অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিএফএসএর এসব ঊর্ধ্বতন পদগুলোকে অ্যাডমিন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ডাম্পিং পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ হয়তো পদোন্নতি পেয়েছেন, কিন্তু ভালো জায়গায় যোগদান করতে পারছেন না, তখন তাকে এই দপ্তরে পাঠানো হয়। কাউকে একটু কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন করে গুরুত্বহীন করার প্রয়োজন পড়লেও এখানে পাঠানো হচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে ঊর্ধ্বতনরা খুব একটা ভূমিকা রাখছেন না।

বিভিন্ন গবেষণায় কৃষিপণ্যে প্রতিনিয়ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। মাটি ও পানি থেকে এই বিষ কৃষিপণ্যের মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশ করে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ নির্বিকার। এ ছাড়া প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষতিকর দিক নিয়েও মাথাব্যথা নেই প্রতিষ্ঠানটির। গৎবাঁধা কিছু সভা সেমিনার, গতানুগতিক কিছু নমুনা পরীক্ষা, লোক দেখানো মোবাইল কোর্ট দিয়েই চলছে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।

সম্প্রতি বিএফএসএ আয়োজিত এক সেমিনারে খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। খাদ্যে অনিরাপদ উপাদান ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। অথচ খাদ্যে দূষণের উৎস খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়াই বিএফএসএর মূল কাজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠান প্রধান যখন আইনের শর্ত পূরণ না করে নিয়োগ পান, তখন পুরো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উপরেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে খাদ্য বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দিযে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার কোনো বিকল্প নেই।

নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সংস্থা। তবে এই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান নিয়োগ বা পদায়নের বিষয়টি দেখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এখানে আমাদের কিছু করার থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘২৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কাউকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে গত বছর একটি রিট হয়েছিল। রিটের চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি। রায় হলে হয় তো এটা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।’

জানা গেছে, গত বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন অতিরিক্ত সচিব জাকারিয়া। তার নিয়োগ কেন অবৈধ ঘোষণার আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে রিটটি করা হয়। জাকারিয়া চলতি বছর সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর চেয়ারম্যান পদটি খালি হয়। এরপর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান শফিকুল ইসলাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত