বউলাগোটার সৌন্দর্য

অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা জঞ্জালময় এই শহরে একটানা অনেক দিন থাকলে সবকিছুই যেন নি®প্রাণ বিষন্ন হয়ে ওঠে। তাই সুযোগ পেলে কিছু দিন পরপরই ঢাকা থেকে পালিয়ে যাই। যাই মানে যেতে বাধ্য হই। নিজেকে সতেজ করার প্রয়োজনে, এমনকি প্রাণশক্তি ফিরে পেতেই শহর ছাড়িয়ে সবুজের কাছে ছুটে যাই। ছুটে যাই শিকড়ের কাছে। যেখানে শীতের বিষন্ন দুপুরে ঘুঘু ডাকে। গ্রীষ্মে খালপাড়ের জারুল গাছ ভরে ওঠে বেগুনি রঙের ফুলে। এমন মুগ্ধতা প্রায় সারা বছরই থাকে। মনে পড়ে, একটি গাছের অপরিপক্ক ফল সরু বাঁশের চোঙায় ঢুকিয়ে বাজি ফোটাতাম। সেই ফলটিই পেকে গেলে ফল থেকে আঠা পাওয়া যেত। সেই আঠা ঘুড়ি বা খাম বানানোসহ কত কাজেই না লাগিয়েছি। পুরনো বাড়ির সেই গাছটি এখন আর নেই। কাটা পড়েছে অনেক আগেই। নতুন বাড়িতেও আপনাআপনিই জন্মেছে একটি। একদিন গাছভর্তি গুচ্ছবদ্ধ পাকা ফল দেখেই আবার মনে পড়ল পুরনো সেই স্মৃতি। দারুমূল্যে উচ্চবংশীয় নয় বলেই ইদানীং গাছটি আর বুনো ঝোপঝাড়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে না।

বউলাগোটা (Cordia dichotoma) স্থানীয়ভাবে বোহাল, বোহারি, বহুবরা বা লারহোরা নামেও পরিচিত। মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা বৃক্ষ, প্রায় ২০মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কান্ড বাঁকানো, শাখা-প্রশাখা ঝুলন্ত, বাকল ছাইরঙ ধূসর বা বাদামি রঙের। পাতা সরল, একান্তর, ডিম্বাকার, সুস্পষ্ট শিরা, আকার-আয়তন পরিবর্তনশীল। কিনারা অনেকটা ঢেউখেলানো বা দাঁতানো। ফুল সাদা, অবৃন্তক, সুগন্ধি ও উভয়লিঙ্গ। বৃতি ঘণ্টাকার, কুঁড়ি অবস্থায় গোলাকার, নিম্নাংশ ডিশের মতো, ৫-খন্ডিত। দলমন্ডল সাদা বা হলুদাভ সাদা, নালিকাকার, ভেতরটা রোমশ। পুংকেশর দলখন্ডের সংখ্যার সমান। ফল ঝুলন্ত, ডিম্বাকার, হলুদ পরিপক্ক অবস্থায় ১-ডিম্বকবিশিষ্ট। বীজ ডিম্বাকার, চ্যাপ্টা, স্বচ্ছ আঠালো মিষ্ট মন্ডের মধ্যে সন্নিবিষ্ট।

ফুল ফোটে ফেব্রুয়ারিতে, ফল পাকে মে-জুনের দিকে।

এ গাছ থেকে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ ও কাঠ পাওয়া যায়। ফল সাঁওতাল আদিবাসী ও শিশুদের প্রিয়। ফলের স্বচ্ছ আঠা পাখি শিকারে, ঘুড়ি তৈরিতে এবং বইয়ের মলাট লাগাতে কাজে লাগে। কোথাও কোথাও ফল ও বীজের শাঁস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। শাঁস চর্মরোগে কাজে লাগে। বাকল থেকে শতকরা ২০ভাগ টেনিন পাওয়া যায়। বাকলের ক্বাথ টনিক হিসেবে অজীর্ণ, উদরাময়, জ্বর ও পেটের অসুখে কার্যকর। কাঠ দিয়ে নৌকা, বন্দুকের কুঁদা, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ছোটখাটো আসবাবপত্র হয়। ভারতের লোধা আদিবাসীরা মূলের ছাল লেই করে ফুসকুড়ি নিরসনে ব্যবহার করে।

এ গাছ আমাদের লোকালয়সংলগ্ন বাগান, বেলেমাটির অরণ্য ও উন্মুক্ত স্থানে আপনাআপনিই জন্মে ও বেড়ে ওঠে। গাছটির আবাসস্থল দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।

লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক