সফিয়ার রহমানের নীরব সবুজ সাধনা

যখন অধিকাংশ মানুষ ব্যস্ত নিজেদের জীবিকা, কর্মজীবন কিংবা অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে, তখন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মদনপুর গ্রামের এক শিক্ষক নীরবে গড়ে তুলছেন সবুজের এক অনন্য জগৎ। তিনি মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সফিয়ার রহমান।

গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাস্তার পাশে, রেললাইনের ধারে, নদীর তীরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে এবং জনপদের নানা প্রান্তে গাছ লাগিয়ে চলেছেন তিনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত

এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আজ তাকে এলাকায় ‘গাছপাগল শিক্ষক’ হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

শুরুর কথা

সফিয়ার রহমানের সবুজযাত্রার শুরু নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯১ সালে তিনি ঝিকরগাছার পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। সে সময় সরকার দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বারবাকপুর বিলপাড়ের রাস্তার ধারে অসংখ্য শিশু ও জামগাছের চারা রোপণ করেন। সময়ের ব্যবধানে অনেক গাছ হারিয়ে গেলেও কয়েকটি জামগাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে, যেন সেই উদ্যোগের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।

১৯৯৬ সালে তিনি মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজে যোগ দেন। এরপর নিজের এলাকা এবং আশপাশের জনপদে গাছ লাগানোর কাজ আরও বিস্তৃত করেন। তবে তার চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ হয় ২০১৪ সালের দিকে। মনিরামপুরের খর্দ গ্রামের রুহুল গাজীর সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হন। রুহুল গাজী লাঙল চাষ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কপোতাক্ষ নদের তীরে তালগাছের আঁটি বপন করতেন। একজন সাধারণ কৃষকের এই অসাধারণ উদ্যোগ সফিয়ার রহমানকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন, একজন কৃষক যদি

প্রকৃতির জন্য এতটা দায়িত্বশীল হতে পারেন, তবে একজন শিক্ষক হিসেবে তারও আরও বড় ভূমিকা রাখা উচিত। এরপর শুরু হয় তালগাছ ও খেজুরগাছ রোপণের বিশেষ উদ্যোগ। কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রায় ১০০টি তালের আঁটি বপন করেন। বর্তমানে সেই আঁটি থেকে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩০টি তালগাছ রাস্তার ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বারো বছর পর গাছে ফলও ধরেছে।

বীজ ছড়িয়ে সবুজের বিস্তার

গত এক যুগে সফিয়ার রহমানের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিস্ময় জাগানোর মতো। ২০১৬ সালের দিকে ঝিকরগাছা-রাজগঞ্জ সড়কে তিনি আম, জাম, কাঁঠালসহ প্রায় ১০ হাজার তালের আঁটি বপন করেন। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার গাছ এখনো বেঁচে আছে। মনিরামপুরের খড়িঞ্চা-রাজগঞ্জ সড়কে দুই বছরে প্রায় দুই হাজার খেজুরগাছ রোপণ করেছেন। এ ছাড়া শৈলি, বসন্তপুর ও তেঁতুলিয়া সড়কে প্রায় ১০ হাজার দেবদারুর আঁটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। পুলেরহাট-রাজগঞ্জ সড়কে প্রশাসনের উদ্যোগে রোপণ করা গাছ নষ্ট হয়ে গেলে বা ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে তিনি আবার নতুন করে সেখানে তালের আঁটি বপন করেছেন।

শুধু রাস্তার ধারে নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও সবুজে ঘিরে রাখতে কাজ করে চলেছেন তিনি। মদনপুর সম্মিলনী ডিগ্রি কলেজ এলাকায় লাগিয়েছেন ৩০ থেকে ৩৫টি তালগাছ, বটবৃক্ষসহ নানা প্রজাতির গাছ। কলেজ ক্যাম্পাসে লাগানো একটি বটগাছের নাম দিয়েছেন ‘জ্ঞানবৃক্ষ’। যশোর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড অধ্যয়নকালে তার নেতৃত্বে ২০টি পেয়ারা গাছও রোপণ করা হয়েছিল।

শিক্ষার্থীরা তার বড় শক্তি

বৃক্ষরোপণের এই যাত্রায় তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শিক্ষার্থীরা। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবেশ রক্ষার চেতনা ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলতে হবে। এখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি মদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ৩০ কেজি খেজুরের আঁটি সংগ্রহ করেছেন। পরে সেগুলো বসন্তপুর, দিঘিরপাড়, তেঁতুলিয়া মোড় হয়ে খাটুরা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় বপন করা হয়েছে।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন

সফিয়ার রহমান এখন আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। বেনাপোল থেকে মংলা পর্যন্ত রেললাইনের ধারে খেজুরগাছের সারি দেখতে চান তিনি। সেই লক্ষ্য নিয়ে মদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শৈলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে খেজুরের আঁটি সংগ্রহ চলছে। দীর্ঘ সময় তার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা নেই। অধিকাংশ ব্যয়ই বহন করেছেন নিজের পকেট থেকে। তবে কখনো কখনো কিছু শুভানুধ্যায়ী পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমেরিকা প্রবাসী আবিদুর রহমান চারা সংগ্রহ ও রোপণে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। আশরাফ ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ৪১টি কৃষ্ণচূড়া গাছ কিনে দিয়েছিল। সেসব গাছের কয়েকটি আজও কলেজ এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে চলেছে।

সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন সফিয়ার রহমান। তাই শিক্ষকতার পাশাপাশি নীরবে-নিভৃতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে পরিবেশ রক্ষার এক নীরব আন্দোলন গড়ে তুলেছেন এই গাছপ্রেমী মানুষটি। তার বিশ্বাস, প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে মানুষকে বৃক্ষের প্রতি ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে হবে। নিজের কাজের সার্থকতা নিয়ে তিনি বলেন, আমার দেখাদেখি একজন মানুষও যদি একটি গাছ লাগান এবং তার যতœ নেন, তাহলেই আমার এই দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক হবে।