বৃক্ষরোপণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই

বাংলাদেশ সরকার ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের একটি বড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় ২০২৬ সালে প্রায় ৫ কোটি চারা রোপণের কর্মসূচি পালিত হবে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং উত্তরণের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন জানিয়েছেন বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান

ধানতারা : ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী : ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য একটি সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। সেলের সদস্য সচিব পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়। এই সেলে আরও আছেন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে জানাবেন  উপদেষ্টা অথবা মন্ত্রী মহোদয়। তবে এই ৫ বছরের প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০২৬ সালে বনায়নের নির্দেশনা আমরা পেয়েছি। এই কর্মসূচির আওতায় প্রথম বছরে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন অধিদপ্তর রোপণ করবে দেড় কোটি, এর সঙ্গে কোস্টাল এরিয়ায় যেমন নোয়াখালী, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বেল্টে আরও ২ কোটি চারা লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেটিও বাস্তবায়ন করবে বন অধিদপ্তর। কোস্টাল এরিয়াতে চারা লাগানো হবে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। সে অনুযায়ী সরকারের প্রথম বছরে আমরা (বন অধিদপ্তর) জানুয়ারি পর্যন্ত মোট সাড়ে ৩ কোটি চারা লাগাব। ৫ কোটির মধ্যে বাদবাকি দেড় কোটি চারা কৃষি মন্ত্রণালয় আছে, সড়ক ও জনপথ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে লাগানো হবে।

ধানতারা : এই চারার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে?

মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী : যে প্রতিষ্ঠান চারা লাগাবে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদের। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট যে সাড়ে ৩ কোটি চারা লাগাবে সেটির রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে সব কিছু ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টই করবে। কৃষি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোও তাদের লাগানো চারার রক্ষণাবেক্ষণ করবে। তবে আমরা সবাইকে বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। যেমন চারা কীভাবে লাগাতে হবে, কোন অঞ্চলে কোন ধরনের গাছ রোপণ করলে ভালো হবে, কতটুকু জায়গায় কী পরিমাণ চারা লাগবে, একটি সুস্থ-সবল চারা বৈশিষ্ট্য কী, চারা রোপণের সময় কোন টেকনিক প্রয়োগ করতে হবে, কোস্টালে কী চারা হবে এই তথ্যগুলো আমরা তাদের জানিয়ে দিচ্ছি।

এ ছাড়া চারা সংগ্রহের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। তারা নিজস্ব উৎস থেকে চারা সংগ্রহ করবে অথবা রিসোর্স ব্যবহার করে সংগ্রহ করবে।

ধানতারা : বেশ কয়েকটি বিভাগের মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে একসঙ্গে কাজ করছে। বিষয়টি সার্বিকভাবে মনিটর করার জন্য কোনো কমিটি আছে কি?

মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী : এ বিষয়ে দুটি কমিটি হয়েছে। একটি হলো জাতীয় বৃক্ষরোপণ সেল (২৫ কোটি চারা রোপণের জন্য)। আর তার অধীনে গঠিত হয়েছে টাস্ক ফোর্স। টাস্ক ফোর্সের সভাপতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং সদস্য সচিব মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন)। প্রয়োজনীয় বিষয় টাস্ক ফোর্সে আলোচনা হয়। সেগুলো আবার সেলে আলোচনা হয়। এই সেলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা যুক্ত আছেন। তারা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মসূচি মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন এবং সেলে অগ্রগতিটা জানান। যেমন এ বছরে ১০টি চারা লাগানো হলেও ১০টি হয়তো বাঁচবে না। আগামী বছর সেখানে আবারও চারা লাগানোর প্রয়োজন হতে পারে। তার পরের বছরও সেখানে কিছু কিছু চারা লাগানোর প্রয়োজন হতে পারে। এই মনিটরিংটি হবে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিবের নেতৃত্বে, আর কেন্দ্রীয়ভাবে একটি অ্যাপস হতে পারে, যে অ্যাপসের মাধ্যমে যতটা সম্ভব রোপিত চারাগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। তবে ২৫ কোটি চারা প্রত্যেকটিকে তো আর ট্র্যাক করা সম্ভব হবে না। কারণ কোস্টাল এরিয়ায় বা গভীর বনের মধ্যে একটি চারাকে তো ট্র্যাক করা সম্ভব হয় না, স্যাটেলাইট থেকে ছবি তুলে সবুজের ঘনত্ব বুঝে ধারণা নেওয়া হবে সার্বিকভাবে কত পার্সেন্ট মারা গেছে, কত পার্সেন্ট বেঁচে আছে সেটা মনিটরিং করা হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ধানতারা : চারা রোপণের ক্ষেত্রে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হয়েছে?

মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী : চারা রোপণের ক্ষেত্রে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা আমাদের রয়েছে। কিন্তু এটি নির্ভর করে কোন অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে তার ওপর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে কিন্তু ফলদ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ বলে কোনো শ্রেণিবিভাগের সুযোগ নেই। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত একটি বা দুটি প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হয়। এখানে পুরোটাই লাগাতে হবে ম্যানগ্রোভ প্রজাতি। এ ধরনের স্থানে সাধারণত কেওড়া, বাইন বা ছইলা লাগানো হয়। আবার যখন বনে চারা লাগানো হয় তখন স্থানীয় ইকো-সিস্টেমকে মাথায় রাখতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের বনে ২৫ কোটির একটা অংশ লাগাতে হলে এমন প্রজাতির গাছ নির্বাচন করতে হবে যেটি ওই পরিবেশে টিকবে। ওখানে আম-কাঁঠাল গাছ নেই এবং এই গাছ ওখানে লাগালে টিকবেও না। ওখানে অন্য প্রজাতির গাছ লাগালে লোকাল ইকো-সিস্টেম যেটা গড়ে উঠেছে সেটা ভেঙে যাবে। এই লোকাল ইকো-সিস্টেমের সঙ্গে তাল মিলিয়েই আমাদের ওই অঞ্চলে বনায়ন করতে হবে। বসত বাড়ির আঙিনায় যদি চারা রোপণের সিদ্ধান্ত হয় তখন একটি ফলদ গাছ লাগানোর কথা চিন্তা করা যেতে পারে। সেখানে বাড়ির বাসিন্দাদেরও একটি চাহিদা থাকবে এবং সেই চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়েই চারা লাগাতে হবে। কারণ আপনার বসতবাড়িতে যদি একটি বনজ গাছ লাগিয়ে দিয়ে আসি সেটা হয়তো আপনি পছন্দ করবেন না। সেখানে যদি একটি ফলদ গাছ লাগানো হয় তাহলে সেটি বাড়ির বাসিন্দারা নিজের আগ্রহেই রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং গাছে ফল ধরলে তারা লাভবান হবে। সেখানে একটি ফলের গাছের পাশাপাশি একটি কাঠ প্রদান করে এমন গাছও লাগানো যেতে পারে। দীর্ঘদিন লালন-পালন করলে গাছটি যে কাঠ দেবে বাড়ির বাসিন্দাদের সেটিও কাজে লাগবে।

ধানতারা : বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী? এবং সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন?

মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী : ২৫ কোটি চারা রোপণ করা হবে ৫ বছরে। অবশ্যই এর মধ্যে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ১৮ কোটি মানুষের দেশে ২৫ কোটি চারা রোপণের জন্য দেশের সব মানুষকেই সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ যে কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ অংশ নেয় এবং নেতৃত্ব দেয় সেটি সফল হয়। সে কারণে আমরা বৃক্ষরোপণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই।

এটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে তাদের তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মাঝেও এই বার্তাটি পৌঁছে গেছে। একটি কর্মসূচি যখন রাজনৈতিক বার্তা হয়ে যায় তখন দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে এই কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন। সাধারণ মানুষকে এ কাজগুলো ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করছে। গত চার দশক ধরে বৃক্ষরোপণ নিয়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি পালনের কারণে সাধারণ মানুষও বৃক্ষরোপণে ভীষণ আগ্রহী। তারই ফলে সারা দেশে প্রায় ১০ থেকে ১১ হাজার নার্সারি গড়ে উঠেছে। তবে চারার চাহিদা যত বাড়বে তত নার্সারির প্রয়োজন হবে। সেজন্য প্রাইভেট নার্সারি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে প্রাইভেট নার্সারির পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির চেষ্টা ও পরিকল্পনা আমাদের আছে।