ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন

বৃক্ষরোপণে নতুন আন্দোলনের ডাক

একসময় বাংলার গ্রাম মানেই ছিল ফলের গ্রাম। বাড়ির উঠোনে আম, জাম, কাঁঠাল, কুল, লিচু, নারকেল, সুপারি, বেল, তেঁতুল, তাল কিংবা গাবের গাছ। সেই গাছ ছিল পরিবারের সদস্যের মতো। শিশুদের খাবার, পাখিদের আশ্রয়, অতিথির আপ্যায়ন, দরিদ্র মানুষের পুষ্টি, গ্রামের অর্থনীতি। সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ফলের গাছ। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই ভূদৃশ্য দ্রুত বদলে গেছে। তার জায়গা নিয়েছে মেহগনি, ইউক্যালিপ্টাস, একাশিয়া, রেইনট্রির মতো বিদেশি এবং কাঠকেন্দ্রিক প্রজাতি। এর মাধ্যমে আমরা গাছ পেয়েছি, কিন্তু হারিয়েছি বৃক্ষসংস্কৃতি। পেয়েছি কাঠের সম্ভাবনা, কিন্তু হারিয়েছি ফলের প্রাচুর্য। পেয়েছি কৃত্রিম সবুজ, কিন্তু হারিয়েছি জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক আশ্রয়স্থল। জাতীয় ফলের জোগান ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যিক বা চাষনির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। অথচ সামাজিক বনায়নের এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েও সম্ভব ছিল সারা দেশের আবাসিক পরিসরের বৃক্ষ-পুষ্টি-কাঠের সমন্বিত উন্নয়ন। বনায়নে একচেটিয়া বিদেশি এবং কাঠনির্ভর বৃক্ষরোপণ যে সুযোগকে প্রায় নষ্ট করে দিয়েছে।

এই পরিবর্তনকে বাংলাদেশের পরিবেশ ও সমাজের জন্য নীরব বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে থাকেন কিছু তরুণ। আর এভাবেই জন্ম নেয় ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন।

কিছু জরুরি প্রশ্ন

ফলদ বাংলাদেশ শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে কোন গাছ লাগানো হচ্ছে? সেই গাছ মানুষের কী কাজে আসছে? পাখি, পতঙ্গ, প্রাণী কিংবা মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? এই প্রশ্নগুলোই তাদের আলাদা করে।

তারা লক্ষ করেন, বৃক্ষরোপণের নামে গত কয়েক দশকে এমন এক বনায়ন-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা দেশের খাদ্য, পুষ্টি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই বাস্তবতা বদলে দেওয়ার জন্য তারা একটি বৃক্ষরোপণকে একটি গণআন্দোলনে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা ঠিক করেন, এই কর্মসূচির আওতায় তারা দেশের প্রতিটি জেলায় ফলদ বৃক্ষরোপণ করবেন। এই বৃক্ষরোপণ কোনো নির্জন মাঠ বা রাস্তার পাশের খালি জমিতে হবে না, বরং বসতবাড়িতে, বসবাসকারীর সম্মতিতেই হবে। এর ফলে তাদের ফলদ বৃক্ষের গুরুত্ব সম্পর্কে যেমন বোঝানো যাবে তেমনি রোপণ পরবর্তী পরিচর্যাও নিশ্চিত হবে গাছের।

৬৪ জেলা পরিভ্রমণ

প্রায় এক যুগ আগে কয়েকজন তরুণ যখন এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, তখন তাদের হাতে ছিল না বড় কোনো তহবিল, ছিল না প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কিংবা রাষ্ট্রীয় সহায়তা। ছিল কেবল একটি ধারণা বাংলাদেশের বৃক্ষরোপণ আন্দোলনকে ফল ও জীববৈচিত্র্যকেন্দ্রিক নতুন পথে ফিরিয়ে নিতে হবে। সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ একটি জাতীয় পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কাজ শুরুর প্রথম ১২ বছরে সীমিত আর্থিক শক্তি নিয়েই ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন দেশের ৬৪ জেলার পদার্পণ করেছে তাদের বাড়ি বাড়ি ফলদ ও দেশীয় জাতের গাছ লাগানোর কর্মসূচি নিয়ে। এ পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন গ্রামে হাজারো বাড়ির আঙিনায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং উপযুক্ত জায়গায় তিন লক্ষাধিক ফলদ বৃক্ষ রোপণ করেছে তারা। গাছগুলো তাদের তত্ত্বাবধানেই বেঁচে আছে, বড় হয়েছে, ফল দিচ্ছে। একটি চারা কেবল গাছে পরিণত হয়নি; অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের পুষ্টির উৎসে পরিণত হয়েছে। যেখানে একটি কাঠগাছ দশ-বিশ বছর ধরে বড় করা হয় কোনো একদিন তা বিক্রি করে টাকা আসবে বলে সেখানে ফল গাছ থেকে রোপণের কয়েক বছরের মধ্যেই সুফল পাওয়া যায়। ফল গাছ থেকে প্রাপ্ত সেই ফল মানুষ এবং পশুপাখি উভয়েরই কাজে আসে। তাছাড়া বহু ফলদ বৃক্ষই ভালো মানের কাঠেরও উৎস। তার বাইরে দেশীয় অনেক কাঠগাছও আছে যার ফল মানুষ না খেতে পারলেও স্থানীয় পশুপাখির জন্য উপযোগী।

বৃক্ষরোপণে চাই নতুন আন্দোলন

একটা মেহগনি বা ইউক্যালিপ্টাস গাছের ফল মানুষ তো খেতে পারেই না, বাংলাদেশের পশুপাখিরও খাদ্য নয় সেগুলো। যে কারণে এসব গাছ দিয়ে বৃহৎ বনায়ন সৃষ্টি হওয়ার পরেও আমাদের জৈবপ্রকৃতিতে তৈরি হয়েছে নীরব এক দুর্ভিক্ষ, খাদ্যশৃঙ্খলার ভয়াবহ বিপর্যয়। যা পশু-পাখি-কীটপতঙ্গ জগৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কেবল কাঠ বিক্রির চিন্তানির্ভর বৃক্ষরোপণ চর্চার কারণে। একটি আমগাছ বছরে কয়েকশ কেজি ফল দিতে পারে। একটি কাঁঠালগাছ একটি পরিবারের দীর্ঘ সময়ের খাদ্য ও অর্থনৈতিক সহায়তা হতে পারে। একটি পেয়ারাগাছ শিশুদের ভিটামিনের ঘাটতি কমাতে পারে। একটি তালগাছ ঝড়প্রবণ অঞ্চলে পরিবেশগত সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, একটি ফল গাছ একই সঙ্গে খাদ্য, পুষ্টি, অর্থনীতি, পরিবেশ ও সংস্কৃতির বাহক। ফলদ বাংলাদেশ এই বহুমাত্রিক গুরুত্বটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

তাদের যুক্তি সহজ। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। একই সময়ে দেশের অসংখ্য রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস এবং ব্যক্তিগত জমিতে এমন গাছ রোপণ করা হচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদনে কোনো ভূমিকা রাখে না। যদি সেই জায়গার একটি অংশও ফলদ ও দেশীয় বৃক্ষ দিয়ে পূরণ করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের পুষ্টি ও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশের অসংখ্য পাখি, মৌমাছি, প্রজাপতি এবং ছোট প্রাণী তাদের খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য দেশীয় বৃক্ষের ওপর নির্ভরশীল। ফলের গাছ কেবল মানুষের জন্য ফল উৎপাদন করে না; তা প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি কাঁঠালগাছ, জামগাছ কিংবা গাবগাছের চারপাশে যে প্রাণবৈচিত্র্য গড়ে ওঠে, একটি মেহগনি বা ইউক্যালিপ্টাস তার বিকল্প হতে পারে না।

ফলে ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন আসলে শুধু বৃক্ষরোপণ করছে না; তারা বাস্তুসংস্থান পুনর্গঠনের একটি ধারণা নিয়ে কাজ করছে। এই ধারণাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তারা নানা ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। চেষ্টা করেছে ফল গাছ রোপণের এই কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের যুক্ত করে একটি আন্দোলনে রূপ দিতে। ৫১২ কিলোমিটার বৃক্ষপদযাত্রা সেই কর্মসূচির মধ্যে অন্যতম। আরেকটি কর্মসূচি হলো, উঠোন বৈঠক। তারা যে বাড়িতে বৃক্ষরোপণ করেছেন বৃক্ষরোপণের আগে সেই বাড়িতে উঠোন বৈঠক করেছেন। তাছাড়া গ্রামে গ্রামে ফলদ বৃক্ষরোপণের সময় সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে, গান গেয়ে নানাভাবে সচেতন করার চেষ্টা করেন। বনায়নকে কেবল পরিবেশগত কর্মসূচির আওতায় না রেখে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ দিতে চেয়েছেন তারা। এক যুগ ধরে তারা এই কাজটি করছেন। আজ যখন পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলা করছে, তখন ফলদ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চিন্তাভাবনা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে এখন এমন বনায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা একই সঙ্গে কার্বন শোষণ, খাদ্য উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে যাকে বলা হচ্ছে ‘ঘধঃঁৎব-নধংবফ ঝড়ষঁঃরড়হং’ বা প্রকৃতিনির্ভর সমাধান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফলদ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সেই দর্শনেরই একটি স্থানীয় সংস্করণ চর্চা করে আসছে। ফলদ বাংলাদেশ এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, যেখানে গাছ মানেই শুধু কাঠ নয়; গাছ মানে খাদ্য, গাছ মানে পুষ্টি, গাছ মানে প্রাণবৈচিত্র্য, গাছ মানে সামাজিক সম্পদ।