বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর এক ম্যাচের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে যখন আলবিসেলেস্তেদের বিদায় প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই মাত্র ১১ মিনিটের ঝড়ে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটল আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমার্ধে বা দুই গোলে পিছিয়ে থেকে ম্যাচ জেতার কোনো রেকর্ড আর্জেন্টিনার ছিল না। আজ সেই ইতিহাস ভেঙে নতুন রূপকথা লিখলেন লিওনেল মেসিরা।
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে চেপে ধরে মিশর। মাত্র ১৫ মিনিটে মারওয়ান আতিয়ার মাপা কর্নার থেকে দুর্দান্ত এক হেডে মিশরকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম।
পিছিয়ে পড়ে গোল শোধের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। ২১ মিনিটে বক্সের ভেতর তাগলিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় তারা। কিন্তু লিওনেল মেসির বাঁ-পায়ের শট দারুণ দক্ষতায় ডানদিকে ডাইভ দিয়ে রুখে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। বিশ্বকাপে এটি মেসির চতুর্থ পেনাল্টি মিস।
প্রথমার্ধের বাকি সময়ে ম্যাক অ্যালিস্টার ও আলভারেজের দুটি নিশ্চিত শট আটকে দিয়ে মিশরের ১-০ গোলের লিড ধরে রাখেন গোলরক্ষক শোবেইর।
দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরু হলে ম্যাচের নাটকীয়তা রূপ নেয় চরমে। যেখানে মূল নায়ক ছিলেন মিশরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো। ৫৮ মিনিট কাউন্টার অ্যাটাক থেকে হাসান ও সালাহর পাসিং কম্বিনেশনে বল পেয়ে আর্জেন্টিনার জালে বল পাঠান মোস্তফা জিকো। মিশরীয় সমর্থকরা যখন উদযাপনে মত্ত, তখনই বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভিএআর । আক্রমণের শুরুতে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করার অপরাধে রেফারি গোলটি বাতিল করেন।
গোল বাতিলের ধাক্কা গায়ে মাখেনি মিশর। ঠিক ৯ মিনিট পর আর্জেন্টিনার একটি কর্নার থেকে বল পেয়ে সালাহ ও হাসানের যৌথ প্রয়াসে বক্সের ভেতর বল পান সেই মোস্তফা জিকো। এবার আর কোনো ভুল হয়নি, মাত্র ৬ গজ দূর থেকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে মিশরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন জিকো।
ইতিহাস বলছিল, বিশ্বকাপে প্রথমার্ধে বা ২ গোলে পিছিয়ে থেকে আর্জেন্টিনা কখনো ম্যাচ জেতেনি। কিন্তু ফুটবল ঈশ্বর আজ অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন। ৭৯ মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে লিওনেল মেসির নিখুঁত এক ক্রসে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো (১-২)।
এই গোলের ঠিক ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেন লিওনেল মেসি। আলভারেজের অ্যাসিস্ট থেকে ডি-বক্সে বল পেয়ে নিখুঁত শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-২ সমতায় ফেরান অধিনায়ক।
এই টুর্নামেন্টে এটি ৮ম এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে ২১ তম গোল মেসির।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে যখন টাইব্রেকারের আবহ তৈরি হচ্ছিল, তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ডানপ্রান্ত থেকে আসা ক্রস উড়ন্ত হেডে মিশরের জালে জড়ান এনজো ফার্নান্দেজ। ৩-২ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা!
এনজোর গোলের পর মাঠ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মিশরের দাবি ছিল গোলটির আগে তাদের খেলোয়াড় ফাউলের শিকার হয়েছিলেন। তীব্র প্রতিবাদের মুখে মিশরের গোলরক্ষক শোবেইর হলুদ কার্ড দেখেন এবং ডাগআউট থেকে তাদের এক স্টাফকে লাল কার্ড দেখানো হয়।
শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে মাঠে তৈরি হয় দুটি বিপরীত দৃশ্য। একদিকে চরম হতাশায় মাঠের ঘাসে বসে পড়েন মোহাম্মদ সালাহ, আর অন্যদিকে আনন্দের অশ্রু চোখে সতীর্থদের বুকে জড়িয়ে ধরেন লিওনেল মেসি। সব ইতিহাস ভেঙে আর্জেন্টিনা চলে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে!