জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে অবিলম্বে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি করেছে জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের পরিবার ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ৬ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি দিয়েছেন জোটের নেতারা। সংসদের বাইরে মানববন্ধন করেছেন নেতাকর্মীরা।
মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা আশা করছি সরকার স্মারকলিপি বিবেচনায় নেবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না করে পার্লামেন্ট চালাবেন, জনগণ এটা মানবে না। ক্ষমতায় বসে জনগণের মতকে উপেক্ষা করে চলবেন, এটাও বাংলাদেশ হতে দেবে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আরও একটি জুলাই বিপ্লব হবে, তারপরও আমরা রাজপথ ছাড়ব না।’
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিচারের দাবি জানিয়েছি, বিচার করতে হবে। যদি বিচার না করেন, তাহলে জনগণ আপনাদের বাধ্য করবে। কারণ আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন, ক্ষমতায় বসে আছেন রক্তাক্ত জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে। আমরা আন্দোলন চাই না সমাধান চাই।
স্মারকলিপি দেওয়া শেষে মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির এখন প্রধান সংকট হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া। এটা যদি বাস্তবায়ন না হয়, এই সংকট বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, স্পিকারকে আমরা বলেছি দেশের অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা উভয়কে সঙ্গে নিয়ে গণভোটে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের রায় বাস্তবায়নে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। স্পিকার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি নিরপেক্ষ তবু তিনি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের সই করা স্মারকলিপিতে ৬ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হচ্ছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের জন্য অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে অধিবেশন আহ্বান করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট, সময়বদ্ধ ও বাধ্যতামূলক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব ব্যক্তি, পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং সহযোগীদের দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা। জুলাই চেতনার আলোকে আইনের শাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা, সুশাসন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া। জুলাইয়ের প্রতিটি শহীদ পরিবার ও আহতদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, পুনর্বাসন, চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সব সহায়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা। জুলাইয়ের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও চেতনাকে জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা করা।
স্মারকলিপি দেওয়ার সময় স্পিকারের সঙ্গে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আমির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর (উত্তর) আমির সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) সেক্রেটারি সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। পরের মাসে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হয়, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।
রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে ২০৯ আসনে জয় পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নিয়েছেন।
অন্যদিকে আলাদা করে উভয় শপথই নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ সদস্য। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে চলে আসা মতবিরোধের ফারাক সেদিনই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়।