১৭ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস

ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ১৭ জেলায় বন্যা হতে পারে। এ সময় দেশের কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গতকাল মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে পাউবো জানায়, আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। ফলে এসব জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে। এদিকে গতকালের ভারী বৃষ্টিতে কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত এবং কয়েকটি জেলায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে পাহাড়ধসে গতকালও তিনজন মারা গেছেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ ছাড়া ভারতের ওড়িশা ও সংলগ্ন দক্ষিণ ঝাড়খ- এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে পূর্ব মধ্যপ্রদেশ সংলগ্ন এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপ হিসেবে অবস্থান করছে। আগামী পাঁচ দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এসব নদীর পানি সময়বিশেষে দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী ১০ জুলাই কিছু স্থানে নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে।

তবে গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি কমেছে। আগামী তিন দিন পানি আরও কমে পরবর্তী দুই দিন বাড়তে পারে। তবে এ সময় নদীগুলো বিপদসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া গঙ্গা ও পদ্মা নদীর পানিও গত ২৪ ঘণ্টায় কমেছে। গঙ্গার পানি আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থেকে পরবর্তী দুই দিন বাড়তে পারে। অন্যদিকে পদ্মার পানি আগামী পাঁচ দিন কমতে পারে। দুটি নদীই বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।

পূর্বাভাসে রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও সাময়িক প্লাবনের সৃষ্টি হতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় তিস্তার পানি ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী, সেলোনিয়া, গোমতী, মুহুরী, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানি ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজারের কিছু এলাকায় বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।

আগামী তিন দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও সাময়িক প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানিও আগামী তিন দিন দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু এলাকায় বিপদসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি : তিন দিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দুই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের নিচু এলাকা তলিয়ে গিয়ে অন্তত অর্ধ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। বৃষ্টির পানি, কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার বেশ কিছু গ্রামীণ সড়ক। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, মৎস্য ঘের ভেঙে পড়েছে সড়ক। অনেক সড়কে হাঁটুপানি জমে রয়েছে। এদিকে আনোয়ারায় দেয়াঙ পাহাড়ে কোরিয়ান ইপিজেডের পানির ঢলে মেরিন একাডেমি সড়ক ভেঙে গাড়ি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পাহাড়ধসে তিনজন নিহত : টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারে ফের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দরিয়ানগর বড়ছড়া হাজীঘোনা এলাকায় এ পাহাড়ধসে লিমা আক্তার (২৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় তার স্বামী জসিম উদ্দিন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ নিয়ে গত দুই দিনে পাহাড়ধসে জেলায় নারী ও শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে গাছের নিচে চাপা পড়ে লক্ষ্মী বিলাস চাকমা (৪০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে বাঘাইছড়ি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের লাইল্যাঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত লক্ষ্মী বিলাস একই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। একটি মৃত গাছের গোড়ায় কাজ করার সময় মাটিসহ ধসে পড়ে গাছটি তার ওপর ভেঙে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয়রা তার মরদেহ উদ্ধার করেন।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ধসে রেনু আক্তার (৫৬) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে উপজেলার ইছাখালী গুচ্ছগ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পাহাড়ধসে বসতঘরের ওপর পড়লে রেনু আক্তার ঘটনাস্থলেই মারা যান। একই ঘটনায় আহত দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুর্দশা : টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত তিন দিনে প্রবল বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যায় ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ পর্যন্ত ১০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন। এ ছাড়া ১৫ হাজার ৮১৩ জন শরণার্থী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সূত্র জানায়, নিহত ১০ জনের মধ্যে দুজন পানিতে ডুবে এবং আটজন পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে মারা যান। পাহাড়ধসে শত শত ঘরবাড়ি ল-ভ- হয়ে গেছে। শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে হাজারো শরণার্থীর। ক্যাম্পে তৈরি হয়েছে এক মানবিক হাহাকার। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৬০ মিলিমিটারের বেশি অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আগামী আরও দুই থেকে তিন দিন এই ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা : খাগড়াছড়িতে তিন দিন ধরে নদী, ছড়া ও খালের পানির বেড়ে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকেছে। ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্নাঞ্চল এলাকার মানুষ। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বাড়ছে। পানিবন্দি পরিবারের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে প্রশাসন।

সাজেক ভ্যালি বন্ধ ঘোষণা : অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসের কারণে রাঙ্গামাটির ‘সাজেক ভ্যালি’ পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। জেলা প্রশাসনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে বাঘাইছড়ির সাজেক ভ্যালির সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটরসহ সর্বসাধারণের ভ্রমণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে।