আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখের কালচে দাগ বা চোখের নিচের ডার্ক সার্কেল দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। এই দাগ ঢাকতে আমরা কত কিছুই না করি। দামি ফাউন্ডেশন, কনসিলার কিংবা রাতারাতি ফর্সা করার দাবিদার নানাবিধ রাসায়নিক প্রসাধনী। কিন্তু সত্যিটা হলো, মেকআপের আস্তরণে সাময়িক খুঁত ঢাকা গেলেও ত্বকের চিরস্থায়ী উজ্জ্বলতা আসে না। রূপবিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম কেমিক্যালের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে আমাদের নজর দেওয়া উচিত ত্বকের আসল পুষ্টির দিকে। আর এই পুষ্টির মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিনে।
আজকাল বিউটি ওয়ার্ল্ড বা স্কিনকেয়ার ট্রেন্ডে সবচেয়ে বেশি যে শব্দগুলো শোনা যায়, তা হলো রেটিনল, নিয়াসিনামাইড বা ভিটামিন সি সিরাম। এগুলো আসলে কোনো জাদুকরী রাসায়নিক নয়, বরং আমাদের অতিপরিচিত কিছু ভিটামিনেরই রূপ। ভেতর থেকে সুস্থ এবং বাইরে থেকে দীপ্তিময় ত্বক পেতে কোন কোন ভিটামিন কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে বিস্তারিত দেখিয়েছে আধুনিক চর্মবিজ্ঞান।
উজ্জ্বলতার ফেরিওয়ালা
‘ভিটামিন সি’
সকালবেলার স্কিনকেয়ার রুটিনে এখন ‘ভিটামিন সি সিরাম’ যেন এক অপরিহার্য নাম। এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। সারা দিন আমাদের ত্বক রোদ, ধুলোবালি আর দূষণের মুখোমুখি হয়, যা ত্বকের কোষগুলোকে বুড়িয়ে দেয়। ভিটামিন সি এই ক্ষতিকর উপাদানগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের মেলানিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, ফলে মেছতা, ব্রণের জেদি কালো দাগ এবং রোদে পোড়া ভাব (ঝঁহ ঃধহ) দূর হয়ে ত্বক হয় উজ্জ্বল। পাশাপাশি কোলাজেন তৈরি বাড়িয়ে ত্বকের টানটান ভাব ধরে রাখে। লেবু, আমলকী বা কমলার মতো টক জাতীয় ফল খাওয়ার পাশাপাশি ত্বকে সরাসরি ভিটামিন সি ব্যবহারের চল এখন বিশ্বজুড়ে।
তারুণ্যের কারিগর ভিটামিন এ
বয়সের কাঁটাকে কিছুটা থমকে দিতে কে না চায়? বয়স তিরিশের কোঠা ছোঁয়া মাত্রই কপালে বা চোখের কোণে সূক্ষ্ম বলিরেখা উঁকি দিতে শুরু করে। এই সমস্যার মোক্ষম জবাব হলো ভিটামিন এ, যার রূপান্তরকে স্কিনকেয়ারের ভাষায় বলা হয় ‘রেটিনল’। রেটিনল মূলত ত্বকের কোষ পুনরুৎপাদনে গতি আনে। অর্থাৎ, মরা চামড়া দ্রুত ঝরিয়ে ভেতরের নতুন, সতেজ চামড়া ওপরে নিয়ে আসে। তবে রেটিনল ব্যবহারের কিছু নিয়ম আছে; তীব্র রোদে কার্যকারিতা হারায় এবং ত্বককে সংবেদনশীল করে তোলে, তাই রূপবিশেষজ্ঞরা রাতে ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
শুষ্ক ত্বকের পরম বন্ধু ভিটামিন ই
যাদের ত্বক শুষ্ক ও খসখসে, শীত-গ্রীষ্ম বারো মাসই যাদের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হয়, তাদের জন্য ত্রাণকর্তা হলো ভিটামিন ই। এটি ত্বকের গভীরে আর্দ্রতা জোগায় এবং সুরক্ষাকবচ বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ তৈরি করে, যাতে ত্বকের ভেতরের পানি সহজে শুকিয়ে না যায়। কাঠবাদাম, চিনাবাদাম কিংবা সূর্যমুখীর তেল এই ভিটামিনের চমৎকার প্রাকৃতিক উৎস।
তৈলাক্ত ত্বকের সমাধানে ভিটামিন বি৩
যাদের ত্বক তৈলাক্ত, তাদের প্রধান শত্রু হলো অতিরিক্ত সিবাম (তেল) এবং বড় বড় লোমকূপ। এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে ভিটামিন বি৩ বা ‘নিয়াসিনামাইড’-এ। এটি ত্বকের তেল উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে রাখে, যার ফলে ব্রণের উপদ্রব কমে যায়। একই সঙ্গে ত্বকের লালচে ভাব ও প্রদাহ দূর করে পোরসগুলোকে সংকুচিত দেখাতে সাহায্য করে। যেকোনো স্কিন টাইপেই খুব সহজে মানিয়ে যায় তাই বর্তমান বাজারে নিয়াসিনামাইডের চাহিদা তুঙ্গে।
ডার্ক সার্কেলের শত্রু ভিটামিন কে
রাত জেগে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে সিরিজ দেখা কিংবা অফিসের কাজের চাপে চোখের নিচে কালি পড়া এখন তরুণ প্রজন্মের সাধারণ সমস্যা। চোখের চারপাশের এই কালচে ভাব ও ফোলা ভাব দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর ভিটামিন কে। এটি চোখের নিচের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোতে রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে, ফলে জমে থাকা কালচে রক্ত সরে গিয়ে চোখ দেখায় সতেজ। বাজারে থাকা ভালো মানের আইক্রিমগুলোতে তাই ভিটামিন কে ব্যবহার করা হয়।
ভেতর ও বাহিরের মেলবন্ধন
শুধু বাইরে থেকে ভিটামিনের সিরাম বা ক্রিম মাখলেই শতভাগ ফল পাওয়া যাবে না। আসল রূপচর্চা শুরু হয় রান্নাঘর থেকে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, রঙিন ফলমূল, ডিম ও বাদাম রাখার মাধ্যমে শরীরকে ভেতর থেকে পুষ্ট করতে হবে।
তবে ত্বকে সরাসরি যেকোনো ভিটামিন সিরাম বা নতুন প্রোডাক্ট ব্যবহারের আগে সতর্কতা জরুরি তা হলো ‘প্যাচ টেস্ট’। কানের পেছনে বা হাতের ত্বকে সামান্য লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা দেখে নেওয়া উচিত সেটি ত্বকে স্যুট করছে কি না। দামি ও ক্ষতিকর কেমিক্যালের মোহে না পড়ে সঠিক ভিটামিনের সঠিক ব্যবহারে সুস্থ ও দাগহীন ত্বক পাওয়া এখন আর কোনো রূপকথা নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবতা।