টেনিস কোর্ট থেকে ফুটবল বিশ্বকাপে

মাঠের বাইরের সব জল্পনা, বিতর্ক আর সিয়াটলের মেঘলা আকাশকে এক নিমেষেই আড়াল করে দিল বেলজিয়ামের এক তরুণ ফরোয়ার্ডের রূপকথার মতো পথচলার গল্প। যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ম্যাচে জোড়া গোল করে পুরো আলো নিজের ওপর কেড়ে নিয়েছেন চার্লস ডি কেটেলিয়ারে। বিশ্বকাপের শেষ ১৬-এর এই অগ্নিপরীক্ষায় রেড ডেভিলদের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট এনে দিয়ে তিনি যখন জয়ের নায়ক, তখন ফুটবলবিশ্ব অবাক হয়ে দেখছে তার লাইমলাইটে আসার পেছনের নাটকীয় অধ্যায়। কারণ, আজকের এই জাদুকরী পারফরম্যান্সের ঠিক আগেই তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে তীব্র মানসিক চাপ, ট্রল আর ব্যর্থতার এক অন্তহীন মরুভূমি।

আজ ফুটবল পায়ে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো ১.৯২ মিটার উচ্চতার এই ফরোয়ার্ডের ক্রীড়া জীবন কিন্তু ফুটবল দিয়ে শুরু হয়নি। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি ছিলেন ফ্লেমিশ টেনিস চ্যাম্পিয়ন! কোর্টে তার ক্ষুরধার প্রতিভা দেখে অনেকেই তাকে ভবিষ্যতের রজার ফেদেরার ভাবতেন। কিন্তু টেনিসের একক লড়াইয়ের মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং হারের পর নিজের ভুলগুলো মেনে নেওয়ার কঠিন বাস্তবতা কিশোর কেটেলিয়ারের জন্য ছিল বেশ পীড়াদায়ক। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘টেনিসে কেউ ম্যাচ হারলে অজুহাত দেওয়ার জায়গা থাকে না, দোষটা সম্পূর্ণ নিজের ঘাড়ে এসে পড়ে। আমি নিজের ভুলগুলো সহ্য করতে পারতাম না।’ কোর্টের সেই একাকিত্ব আর প্রতিপক্ষের অসততা সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে মায়ের অনুপ্রেরণায় তাকে মেডিটেশনও করতে হয়েছিল নিজেকে শান্ত রাখার জন্য। শেষ পর্যন্ত টেনিস র‌্যাকেট ছেড়ে বুটজোড়া পায়ে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি যে কতটা যুগান্তকারী ছিল, সিয়াটলের রাতই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

টেনিস ছেড়ে নিজের শহরের ক্লাব ব্রুজের ফুটবল একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মাঠের বহুমুখী প্রতিভা দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন তিনি। মাঝমাঠ, উইঙ্গার কিংবা ‘ফলস নাইন’ সব পজিশনেই তিনি ছিলেন সমান কার্যকর। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বেলজিয়ান স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ডসে যখন তিনি ‘প্রমিজ অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পান, তখন রোমেলু লুকাকু ও ডিভোক ওরিগির মতো তারকাদের পাশে তার নাম উচ্চারিত হতে শুরু করে। এর আগে মাত্র ১৯ বছর বয়সে পিএসজির মতো জায়ান্টের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে হঠাৎ শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়ে রাতারাতি নজরে আসেন তিনি। পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার জেনিতের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করে নিজের জাত চেনান। ক্লাব ব্রুজের হয়ে শেষ মৌসুমে ১৮ গোল আর ১০ অ্যাসিস্টের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে নিয়ে যায় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। যেখানে ২০ বছর বয়সের আগেই চ্যাম্পিয়নস লিগে একাধিক গোল করা প্রথম বেলজিয়ান হিসেবে রেকর্ড গড়েন তিনি। এই চোখ ধাঁধানো প্রতিভার কারণেই ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ৩২ মিলিয়ন ইউরোর চড়া মূল্যে তাকে সান সিরোতে উড়িয়ে আনে ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলান।

কিন্তু মিলানে আসার পরই শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। দীর্ঘ পা, গতিময় ড্রিবলিং আর মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে খেলার দক্ষতার কারণে ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যম তাকে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি ‘কাকা’র সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে। এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ইতালিয়ান ফুটবলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে মিলানের হয়ে পুরো মৌসুমে ৪০ ম্যাচ খেলে একটি গোলও করতে পারেননি তিনি, নামের পাশে ছিল মাত্র একটি অ্যাসিস্ট! এই গোল খরা আর আত্মবিশ্বাসের তলানিতে থাকা ফুটবলারকে নিয়ে সে সময় বিস্তর ট্রল ও সমালোচনা হয়। নিজের ভুলের প্রতি কঠোর থাকা এই ফুটবলার মায়ের সঙ্গে বসে নিজের ম্যাচের খতিয়ান দেখতেও পছন্দ করতেন না, কারণ মা সব ভালো দেখলেও তিনি খুঁজতেন নিজের ঘাটতিগুলো।

অনেকেই যখন তার ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন, ঠিক তখনই আটালান্টায় যোগ দিয়ে নতুনভাবে পুনর্জন্ম হয় তার। জিয়ান পিয়েরো গাসপেরিনির অধীনে আটালান্টার জার্সিতে হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার পর, এবার বেলজিয়ামের জার্সিতে বিশ্বমঞ্চের শেষ ১৬-এর ম্যাচে ফিরিয়ে আনলেন নিজের সেই চেনা রূপ।