মরক্কোর প্রতিশোধ, নাকি ফ্রান্সের পুনরাবৃত্তি

বস্টনের গিলোট স্টেডিয়ামের আকাশে সূর্য ডোবার আগেই ফুটবলবিশ্বের চোখ ফিরে যাবে চার বছর আগের এক রাতে। কাতারের সেই আল বায়েত স্টেডিয়াম, যেখানে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল আফ্রিকার প্রথম সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। থিও হার্নান্দেজ আর কোলো মুয়ানির পায়ে সেদিন স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল আটলাস সিংহদের; ২-০ গোলে জিতে ফাইনালের টিকিট কেটেছিল ফ্রান্স। চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সেই দুই প্রতিপক্ষ আবার মুখোমুখি। এবার কি ফরাসি দাপটের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি প্রতিশোধ নেবে মরক্কো?

ইতিহাসের পাতা উল্টালে অবশ্য পাল্লাটা ফ্রান্সের দিকেই ঝুঁকে। দুই দলের ছয়বারের দেখায় চারবারই জিতেছে ফরাসিরা। মরক্কোর ঝুলিতে জয় মাত্র একটি, সেটিও টাইব্রেকারে। তবে পরিসংখ্যান যা-ই বলুক, বর্তমান মরক্কো সেই ইতিহাস উল্টে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস নিয়েই আজ মাঠে নামবে।

চলতি বিশ্বকাপে এতদিন ফ্রান্সের পরীক্ষা হয়েছে মূলত আক্রমণের ধার আর মানসিক দৃঢ়তার। কিন্তু মরক্কোর সামনে দিদিয়ের দেশমের দলকে এবার দিতে হবে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা। আফ্রিকার এই প্রতিনিধিরা রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি বল পায়ে রেখে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিতেও বেশ দক্ষ। ফলে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের সামনে আজ এমন এক দল, যারা প্রয়োজনে ম্যাচের ছন্দ থামিয়ে দিতে পারে, আবার চোখের পলকে পাল্টা আক্রমণে গেঁথে দিতে পারে বিষদাঁত।

চার বছর আগের সঙ্গে বর্তমান মরক্কোর বিস্তর ফারাক। কাতার বিশ্বকাপে তারা ছিল বিস্ময়কর আন্ডারডগ। এবার কোচ মোহামেদ ওয়াহবির অধীনে আশরাফ হাকিমিরা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়েই উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছে। গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থাকার পর নকআউটে নেদারল্যান্ডস ও সহ-আয়োজক কানাডাকে যেভাবে তারা উড়িয়ে দিয়েছে, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দলটির পরিকল্পিত ফুটবলের ছক।

ম্যাচের আগে মরক্কো কোচ ওয়াহবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "আমরা প্রশংসা শুনে সন্তুষ্ট হতে আসিনি। আমাদের লক্ষ্য বিশ্বকাপ জয়।" মরক্কোকে নিয়ে যথেষ্ট সমীহ ঝরেছে ফ্রান্সের সহকারী কোচ গিলেস স্তেফাঁর কণ্ঠেও, "তারা খুবই সংগঠিত ও সুশৃঙ্খল দল। রক্ষণভাগে দারুণ দৃঢ়তা রয়েছে এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে তারা মারাত্মক কার্যকর।"

টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স এবারও টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৪টি গোল করে দাপট দেখাচ্ছে। তবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পেতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ঘাম ছুটে গিয়েছিল ফরাসিদের। পেনাল্টি থেকে পাওয়া এমবাপ্পের একমাত্র গোল বাঁচিয়ে দেয় তাদের মান। টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ৭ গোল করা এমবাপ্পের সঙ্গে উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিস আর ব্র্যাডলি বারকোলার গতি যেকোনো রক্ষণকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দিদিয়ের দেশম তাই শিষ্যদের আজ মরক্কোর বিপক্ষে আরও বেশি 'ক্লিনিক্যাল' বা কার্যকারী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

"মরক্কোর খেলার ধরন প্যারাগুয়ের মতো নয়। চার বছর আগে সেমিফাইনালে ওদের সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল। ওরা আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের ফাইনাল খেলেছে। দলে দারুণ সব ব্যক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে। ওরা এখানে স্রেফ অংশ নিতে আসেনি, জিততে এসেছে। তাই এই দুর্দান্ত দলটির বিরুদ্ধে লড়তে আমাদের পুরোপুরি প্রস্তুত থাকতে হবে।"

এই ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত নাম মরক্কোর সেন্টারব্যাক ইসা দিয়োপ। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ২৯ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার একসময় ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলেছেন এবং ফরাসি মূল দলেই খেলার স্বপ্ন দেখতেন। তবে ভাগ্যের পরিহাসে গত মার্চে মরক্কোর জার্সিতে অভিষেকের পর এখন তিনিই দলটির রক্ষণভাগের অন্যতম স্তম্ভ। আজ নিজের জন্মভূমির আক্রমণভাগ রুখে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব থাকবে তার কাঁধেই।