সংবিধান সংশোধন করতে হবে 

সংবিধান সংশোধনীও একটা আইন, যেটা সংসদে পাস করে। আর যেকোনো আইনকে সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিবেচনা করে অসাংবিধানিক বা বেআইনি ঘোষণা করতে পারে। বেআইনি ঘোষণা করলে সেই আইনের কার্যকারিতা লোপ পায়।

সংবিধানে বলা আছে, সুপ্রিম কোর্টের রায় নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের জন্য অবশ্য পালনীয়। সেখানে সংসদের কথা বলা নেই। আইন তো করবে সংসদ। সুপ্রিম কোর্ট কখনো আইন করতে পারে না, যেমন সংসদও বিচার কার্যক্রম চালাতে পারে না। ওনারা (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার ধারা, ৭ (ক) ও ৭ (খ) ও গণভোট বেআইনি বলেছেন। ৭ (ক) ও ৭ (খ) ছিল উদ্ভট ধারা। এখন এই ধারা বেআইনি হয়ে গেছে। আমার মনে হয় না সংসদ আর এ বিষয়ে কিছু করবে। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের ধারাটা সুপ্রিম কোর্ট বেআইনি বলেছেন। তার মানে এখন প্রশ্ন হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে হবে? আগে ছিল, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান এবং ১০ জন থাকবেন উপদেষ্টা।

এখন কে হবেন, কীভাবে হবেন তার রূপরেখা কীভাবে হবে, সেটা ঠিক করার জন্য সংসদকে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে এবং আইন পাস করে বলতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট আগেরটা (ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন বাতিলের রায় বাতিল) পুনরুজ্জীবিত করেছেন বলে বলা হয়েছে। কিন্তু এর আইনি ব্যাখ্যার সঙ্গে আমার দ্বিমত আছে। পুনরুজ্জীবিত করা মানে তো আগের আইনটাকে বহাল করল। কিন্তু আইন বহাল করাটা সম্পূর্ণ সংসদের এখতিয়ার। অতএব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কী হবে, মেয়াদ কতদিন হবে, প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন সেটা নির্ধারণ করতে কমিটি করা হবে। সবকিছু মিলিয়ে সংসদকে একটি সংবিধান সংশোধনী আইন পাস করতে হবে।

৫৫ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আমাদের দেশে ভালো এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এটা বারবার প্রমাণ হয়েছে। আমরা এটাও বলছি, রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করা যায় না। অর্থাৎ রাজনীতিবিদদের অধীনে নির্বাচন হলে তা সুষ্ঠু হবে না। পক্ষান্তরে এটাও মেনে নিচ্ছি, রাজনীতিবিদদের প্রতি আমাদের আস্থা নেই।

যেকোনো দেশে জাতীয় নির্বাচন হলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটা। নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনীতিবিদদের প্রতি আমাদের আস্থা নেই। এর সঙ্গে এই প্রশ্ন আসে, অন্য কোনটার ব্যাপারে রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা আছে, অথবা আস্থা নেই? অন্যদিকে রাজনীতিবিদেরাও প্রকারন্তরে স্বীকার করে নিচ্ছেন, তাদের প্রতি আস্থা নেই। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এ কারণেই অনির্বাচিত লোকদের দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা করতে হয়। পাকিস্তান ছাড়া আর কোথাও এ ব্যবস্থা আছে বলে আমার মনে পড়ে না। এখন তাদের (রাজনীতিবিদ) ওপর যাতে মানুষ আস্থা ফেরে, সেজন্য ওইভাবেই কাজ করতে হবে। এই জায়গাটাতে আমরা একটা গোলমেলে অবস্থায় আছি।

আশা করব, গণঅভ্যুত্থানে এত আত্মত্যাগের পর যে সরকার এসেছে সেই  সরকার আগের সরকারের থেকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করবে। অনেকে হয়তো বলতে পারেন গত সাড়ে চার মাস ধরে সরকার তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। তবে আমার মূল্যায়ন হলো, সরকার অন্ততপক্ষে ভালো কাজ করার চেষ্টা করছে। আর চেষ্টা করলেই যে সবকিছুতে সফল হবে বিষয়টি এমন নয়। তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জায়গা থেকে সরে আসছে, এটা ভালো লক্ষণ। এভাবে চলতে থাকলে আমার মনে হয়, রাজনীতিবিদদের ওপরে আমাদের আস্থাও ক্রমান্বয়ে বাড়বে।

ড. শাহদীন মালিক

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ