পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে মাশহাদে সমাহিত খামেনি

যথাযথ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে সমাহিত করা হয়েছে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে। গতকাল বৃহস্পতিবার কারবালা থেকে বিমানযোগে মাশহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয় খামেনির কফিন। নিজ জন্ম শহরে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে ইমাম রেজা মাজার কমপ্লেক্সে দাফন করা হয়। প্রতিবেশী ইরাকের নাজাফ ও কারবালার শোকযাত্রায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মানুষ জড়ো হওয়ায় আলি খামেনির দাফন কিছুটা বিলম্বিত হয়। তবে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই ইরানের সবচেয়ে পবিত্র মাজার হিসেবে পরিচিত সোনালি গম্বুজবিশিষ্ট ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারের সামনে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। তারা ইরানের পতাকা, প্রয়াত খামেনির ছবি এবং বিপ্লবের সেøাগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে শোক মিছিলে অংশ নেন। মাশহাদের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াটি ছিল সপ্তাহব্যাপী চলমান শোক মিছিল, সমাবেশ এবং শোকাতুর অনুষ্ঠানের সমাপনী।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু হয়েছে। মাশহাদে খামেনির মরদেহবাহী শোকযাত্রার অপেক্ষায় থাকা জনতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার দাবিতে সেøাগান দিতে থাকে। ‘আমরা সর্বোচ্চ নেতার রক্তের কসম খেয়ে বলছি, ট্রাম্প, আমরা তোমাকে হত্যা করব!’ বলে তারা চিৎকার করেন। নারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘কিল ট্রাম্প’ (ট্রাম্পকে হত্যা করো)। মাজার অভিমুখে যাওয়া সড়কগুলো কালো পোশাক পরিহিত শোকার্ত মানুষের সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। পাশাপাশি তাদের হাতে ছিল প্রতিশোধের বার্তা দেওয়া লালপতাকা। এ সময় শোকসন্তপ্ত ইরানিরা খামেনির প্রশংসা এবং শত্রুদের ধ্বংস করার সেøাগান দিচ্ছিলেন। তীব্র গরমে শোকার্তদের ঠা-া রাখতে ওপর থেকে পানি ছিটানো হয়।

গত এক সপ্তাহ ধরে খামেনির মরদেহ ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। খামেনি এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের অন্য চার সদস্যের মরদেহ ইতিমধ্যে তেহরান, শিয়া ধর্মীয়কেন্দ্র কোম নগরীতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রতিটি স্থানেই বিশাল জনসমাবেশ শোকগাথা ও বিপ্লবী সেøাগানের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানায়। শিয়া ধর্মতত্ত্বে ‘শাহাদাত’ একটি কেন্দ্রীয় বিষয় এবং বিদেশি শত্রুর হাতে খামেনির মৃত্যু ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রভাব ফেলেছে। ইরানের ধর্মীয় নেতারা এই বিশাল গণজমায়েতকে তাদের রাষ্ট্রের শক্তি ও আদর্শিক দৃঢ়তা প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলা : গত বুধবার রাতে ইরানের ওপর নতুন দফায় হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, সামরিক বাহিনী ইরানের ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুদাম, নৌসক্ষমতা এবং ইরানের উপকূলজুড়ে সামরিক রসদ অবকাঠামো। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছিল। আলজাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তেহরান-মাশহাদ রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই শহরের মধ্যে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার ‘তীব্র প্রতিক্রিয়া’ দেখিয়েছে ইরান। পাল্টা জবাব দিতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাহরাইন ও কুয়েতে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌ ও বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তারা যৌথভাবে কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ও আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমান ঘাঁটি ও জুফায়ারসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

উল্লেখ্য, জুফায়ারে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশসমূহ এবং পূর্বাঞ্চলের দুটি সেতুতে ওয়াশিংটনের হামলার জবাবেই এই পাল্টা আঘাত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের ঘটনায় ইরানের পাঁচটি প্রদেশে অন্তত ১৪ জন নিহত ও ৭৮ জন আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।