তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট ফিরছে

সময়ের হিসাবে দেড় দশক। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও টানাপড়েন। এরপর তিন তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন। সবশেষে গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবার ফিরল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয় পরিবর্তন করা হয়েছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় গতকাল বৃহস্পতিবার এক আদেশে বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। খারিজ করে দেওয়া হয়েছে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল। এর ফলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই পুনর্বহাল হচ্ছে।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ রায় দেয়। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হবে। আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে জনমত যাচাই ও গণভোটে চূড়ান্ত হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাসের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০, গণভোট বাতিল, সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতিসহ ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের ঝড় ওঠে। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকে দেশে ভোটাধিকারের পথ অনেকটা রুদ্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনী ব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়ে। আওয়ামী লীগের অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনাও দেখা গেছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৈরি হয় নতুন প্রেক্ষাপট। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজ উদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান পঞ্চদশ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে ১৮ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করেন।

এই রিটের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল বলে রায় দেয়। ২০ ধারার সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। আর ২১ ধারার মাধ্যমে সংবিধানের বিধান পরিবর্তন বা সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত যাচাইয়ের জন্য গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে বলে রায় দেয় হাইকোর্ট।

এরপর গত বছরের ৩ অক্টোবর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চেয়ে আপিল বিভাগে আপিল করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চারজন। পরে বিএনপির পক্ষে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণফোরাম নেতা সুব্রত চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন আপিল মামলায় পক্ষভুক্ত হন।

আদালতে সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এছাড়া সাংবিধানিক এ মামলায় ইন্টারভেনার (তৃতীয় পক্ষ) হিসেবে যুক্ত গণফোরামের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ শুনানিতে ছিলেন। দীর্ঘ শুনানি শেষ গতকাল হাইকোর্টের রায়ই বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ।

কী ছিল হাইকোর্টের রায়ে : ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল বলে রায় দেয়। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব (এখন আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ রায়টি দিয়েছিল।

হাইকোর্ট এ দুটি ধারাসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, (সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা),৭খ (সংবিধানের মৌলিক বিধান সংশোধনে অযোগ্যতা) এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে তা বাতিল করে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলে, ‘ধারা দুটি (পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা) সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র।’ রায়ে আরও বলা হয়, ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা গণতন্ত্র, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, যেগুলো সংবিধানের মূল কাঠামো, তা ধ্বংস করেছে।’

রাষ্ট্রপক্ষ ও আপিলে পক্ষভুক্ত আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া : আপিল বিভাগের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল। পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট করা হয়, তখন হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল। এর অন্যতম হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানে ৭ক, ৭খ বাতিলের রায় বহাল।’

তিনি বলেন, ‘এখনো পূর্ণাঙ্গ রায়টি পাইনি। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে বলতে পারব আদালত কোন কোন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। আপিলটি সরাসরি খারিজ হয়েছে। সুতরাং হাইকোর্টের রায়টা বহাল রাখার পাশাপাশি আপিল বিভাগ কিছু পর্যবেক্ষণ দিতে পারে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় আসবে। তাই জাতীয় সংসদ হয়তো পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করলেও করতে পারে এবং সেটা তাদের ওপর (সংসদ) নির্ভর করবে।’

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘সংবিধান এবং আইনের ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল। যুগের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন করতে হয়, এগুলো তো আইনগত প্রক্রিয়ায় আছেই। তাই ভবিষ্যতে কী হবে আর কী হবে না, সে বিবেচনা করে এখন তো সিল (বন্ধ করা) করা যাবে না। ভবিষ্যৎকে বাঁধার মতো কোনো লিগ্যাল মেকানিজম আমাদের হাতে নেই।’

ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন হওয়ার পরে সংসদ যদি মনে করে, আগে যে কাঠামোতে এই ব্যবস্থা বহাল ছিল সেটা এখন আরও পরিমার্জন করবে তাহলে সেই ক্ষমতা সংসদের আছে। তবে সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না বলেই আমাদের প্রত্যাশা।’

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে চারটি বিষয় হাইকোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল তার মধ্যে বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ (ক) ও ৭ (খ) রয়েছে। এই অনুচ্ছেদগুলোতে ছিল, এই সংবিধানের কতগুলো বিষয় পরিবর্তন করা যাবে না। কেউ পরিবর্তন করতে চাইলে সেটা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহ। হাইকোর্ট বিভাগ এই অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। আপিল বিভাগেও এই অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক থেকে গেল।’

শিশির মনির বলেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগ গণভোটের বিধানকে ফিরিয়ে এনেছিল। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমেও গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তিত হলো। এছাড়া সংবিধানের ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এই রিটের ক্ষমতা প্রদানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। আপিল বিভাগেও সেটা বহাল রইল।’

অ্যাডভোকেট শিশির মনির আরও বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগ একে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের আদেশটি বহাল থাকবে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসতে আর কোনো বাধা থাকছে না। এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের দায়িত্ব অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছে। জুলাই চার্টার (জুলাই সনদ) থেকে শুরু করে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ তারা নেবে, এ চার বিষয় ছাড়া বাকিগুলো সংসদের সামনে উন্মুক্ত থাকল।’

ফিরে দেখা ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায় : সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ২০১১ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয় তখনকার প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ সাত বিচারকের আপিল বেঞ্চ। তিনিসহ চার জন বিচারকের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে এ রায় দেওয়া হয়। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।

তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় রিভিউয়ের (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করা হয়। এরপর গত বছরের ২০ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদসহ (এখন অবসরে) আপিল বিভাগের বেঞ্চ আগের রায়ের পুরোটা বাতিল করে নতুন রায় দেয়।

আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়টি ছিল কলঙ্কিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিধানাবলি ভবিষ্যৎ প্রয়োগ যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং সংবিধানের পুনরুজ্জীবিত অনুচ্ছেদ ৫৮খ (১) এবং ৫৮গ (২) এর বিধানাবলির প্রয়োগ সাপেক্ষে কার্যকর হবে।