চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও শমসেরপাড়া এলাকায় এখনো হাজারো মানুষ পানিবন্দি। এ এলাকাতেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের রেললাইন গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত আড়াই ফুট পানির নিচে ছিল। একই সঙ্গে চান্দগাঁও, হাজিপাড়া, পাঁচলাইশসহ বিশাল এলাকার মানুষ পানিবন্দি। একই অবস্থা নগরীর পতেঙ্গা এলাকাতেও পানি নামছে ধীরগতিতে। আর এতেই বাড়ছে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ। জলাবদ্ধতা নিরসনে যখন চলমান চার প্রকল্প প্রায় শেষের পথে, সেখানে আবারও জলাবদ্ধতা দুর্ভোগে প্রকল্পের সুফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বৃষ্টি হলেই নগরীতে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ দেখা দেবে তা পুরনো কথা। কিন্তু এবার গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিগত ৬০ ঘণ্টায় পতেঙ্গাকেন্দ্রে ৭৩৫ মিলিমিটার এবং আমবাগানকেন্দ্রে ৭১২ মিলিমিটার একটানা বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। অতিভারী এ বৃষ্টির পর যে হারে নগরীর ষোলোশহর দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, চকবাজারা কিংবা প্রবর্তক মোড় এলাকায় পানি জমার কথা ছিল সেই হারে পানি জমেনি। তবে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, পশ্চিম মাদারবাড়ি, হালিশহর কে ব্লক, এল ব্লক, ছোটপুল শান্তিবাগ, ইস্পাহানি রেলগেট, ওয়্যারলেস মোড়, কাতালগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা হলেও পানি নেমে গেছে। তবে সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থা দেখা দিয়েছে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, পশ্চিম মাদারবাড়ী, পাঁচলাইশ, হাজিপাড়া, চান্দগাঁও প্রভৃতি এলাকায়। এসব এলাকা থেকে সহজে পানি নেমে যায়নি এবং কোথাও গতকালও পানি দেখা গেছে। কিন্তু গতকাল দিনভর বৃষ্টির তীব্রতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল। গতকাল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় পতেঙ্গাকেন্দ্রে ১০২ দশমিক ৬ মিলিমিটার এবং আমবাগানকেন্দ্রে ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। তাহলে এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কমে গেলেও পানি নামছে না কেন?
আটকে আছে বৃষ্টির পানি : কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি যাতে খাল দিয়ে নগরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য খালের মুখে সøুইসগেট (রেগুলেটর) বসানো হয়েছে। কিন্তু জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে না পারলেও বৃষ্টিতে জমে যাওয়া পানি বের হতে না পেরে বেড়েছে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ। আর এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ এলাকা। এ বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার এলাকা দিয়ে নগরীর একটি বিশাল অংশের পানি কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ে। কিন্তু জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন হওয়া খালগুলোর অনেক স্থানে বাঁধ দেওয়া ছিল এবং খালের মধ্যে মাটি ছিল। এতে পানি চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমরা বাঁধগুলো কেটে দিয়েছি।’
শুধু কি বাঁধের কারণে পানি যাচ্ছে না? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খালের মুখে সøুইসগেট দেওয়া হয়েছে। এতে জোয়ারের পানি আসতে না পারলেও বৃষ্টিতে আটকে যাওয়া পানি দ্রুত হারে নেমে যেতে পারছে না। এতে বৃষ্টির তীব্রতা কমে যাওয়ার পরও পানি নামতে পারছে না এবং এলাকাবাসী দুর্ভোগে আছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরীর পতেঙ্গা ও চান্দগাঁও এলাকা থেকে পানি নামছে না কথাটি সঠিক। তবে এ এলাকা থেকে যাতে পানি দ্রুত নেমে যায় আমরা সেই উদ্যোগ নিয়েছি।
সøুইসগেট যথার্থতা না বলে অভিযোগ উঠেছে : স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় এ প্রকল্পের ডিজাইন করা হয়েছিল, তখনই আমরা বলেছিলাম সøুইসগেটগুলো আরও চওড়া করার জন্য। কিন্তু তা করা হয়নি। আর এবার রেকর্ড বৃষ্টি হয়েছে সত্যি, কিন্তু পানি তো নেমে যেতে হবে। পানি সহজে নামছে না।
এ অভিযোগের বিষয়ে একই মন্তব্য করেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন,‘ সøুইসগেট নির্মাণের সময়ই আমরা বলেছিলাম ক্যাচমেন্ট এরিয়ার পানির পরিমাণের সঙ্গে সমন্বয় করে সøুইসগেট চওড়া করার জন্য। কিন্তু তা করা হয়নি। চওড়া খালকে সøুইসগেটের কাছে গিয়ে সরু করা হয়েছে। আর এবারের বৃষ্টি জলাবদ্ধতা প্রকল্পগুলোর জন্য একটা পরীক্ষা হয়ে গেল। সব প্রকল্প প্রায় শেষ হলেও জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ থেকে নগরবাসী রেহাই পায়নি।’
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ব্রিগেড। এ বিষয়ে কথা হয় সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, নগরীর আগে যেসব এলাকায় পানি জমত, এবার কিন্তু রেকর্ড বৃষ্টি হলেও সেই হারে পানি জমেনি দ্রুত নেমে গেছে। তবে নগরীর ভেতরে না জমলেও নগরীর প্রান্তীয় এলাকায় পানি জমেছে। মূলত এসব এলাকা ছিল একসময় ধানি জমি কিংবা পরিত্যক্ত ভূমি, যা জলাধার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এগুলোতে এবার পানি জমেছে। আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে অপর দুই প্রকল্পের আওতায় যেসব রেগুলেটর বা সøুইসগেট বসানো হয়েছে, সেগুলো দিয়ে সঠিকভাবে পানি অপসারণ হচ্ছে কিনা? সিডিএ চেয়ারম্যান সেসব সøুইসগেট মনিটরিংয়ের জন্য আমাদের বলেছে আমরা চেক করে দেখব এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, আমরা সেনাবাহিনীর ৩৪ ব্রিগেডকে বলেছি সøুইসগেটগুলো মনিটরিং করার জন্য। একই সঙ্গে পতেঙ্গায়ও যাতে পানি নেমে যায়, সেই ব্যবস্থা নিতে বলেছি।
আসছে নতুন প্রকল্প : এবারের ভারী বৃষ্টির পরও নগরীতে তেমন হারে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হওয়ার পেছনে অবশ্যই জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর অবদান রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্ট পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান। তিনি বলেন, সিডিএর মেগাপ্রকল্পের ৬৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, সিটি করপোরেশনের বাড়ইপাড়া খাল প্রকল্প শেষ হয়েছে এবং সিডিএর আরেকটি প্রকল্পে ১২টি খালের মুখে সøুইসগেট ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের কাজও প্রায় শেষ। এসব প্রকল্পের কারণে এবার তুলনামূলকভাবে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ কম হয়েছে।
তিনি বলেন, তবে চান্দগাঁও ও পতেঙ্গা এলাকায় পানি কেন সহজে নামতে পারছে না তা খতিয়ে দেখে সমাধান করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন থেকে কাজ করছেন। তিনি বলেন,‘ সিডিএ নগরীর ৩৬টি খাল নিয়ে প্রকল্প নিয়েছে। আমরা নগরীর বাকি ২১টি খাল নিয়ে নতুন করে প্রকল্প গ্রহণ করছি। সব খালের সংস্কার না করলে নগরী জলাবদ্ধতামুক্ত হবে না।’ তিনি বলেন, একই সঙ্গে সিডিএ ৩৬টি খাল শেষ করার পর এসব খাল কীভাবে মেইনটেন্যান্স করা হবে তা নিয়েও আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
জলাবদ্ধতার প্রকল্প শেষ হলেও নগরী জলমগ্ন হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘নগরীর ২১টি খাল বাদ দিয়ে জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম আশা করা যায় না। তাই এবার বাকি ২১টি খাল নিয়ে সিটি কপোরেশন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করছে। সেই প্রকল্প শেষ হলে নগরী পুরো জলাবদ্ধতামুক্ত হবে।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বহদ্দারহাট থেকে বারইপাড়া পর্যন্ত এক হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় একটি নতুন খাল খননের প্রকল্প শেষ হয়েছে। অন্যদিকে সিডিএর দুই হাজার ৭৭৯ কোটির প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সøুইসগেট নির্মাণের আওতায় ১২টি সøুইসগেট রয়েছে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের আরেক প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৫০৮ কোটি টাকায় কর্ণফুলীর মোহনা থেকে উজানে মদুনাঘাট পর্যন্ত ২৩টি সøুইসগেট রয়েছে। আর ৩৯টি সøুইসগেটের মাধ্যমে কর্ণফুলী থেকে নগরীর খালগুলোতে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ার কথা। সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান রয়েছে।