চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলার বিভিন্ন পুকুর ও দিঘিতে ‘বড়শি প্রতিযোগিতা’ কিংবা ‘মৎস্য শিকার’-এর নামে বিরাট অঙ্কের আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই রকম প্রতিযোগিতাকে জুয়ার ফাঁদ হিসেবে অভিহিত করেছেন আইনজ্ঞরা। বড়শি প্রতিযোগিতার নামে জুয়ার আসর পরিচালনার জন্য চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তাদের নেটওয়ার্ক। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে সক্রিয় হয়ে ওঠে এ চক্রটি।
চট্টগ্রামের মানবাধিকার আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড়শি প্রতিযোগিতার নামে লাখ লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে। ৪০ কেজি ওজনের মাছ আছে বলে প্রচার করা হয়। অথচ সংশ্লিষ্ট পুকুর বা দিঘিতে সর্বোচ্চ কত কেজি ওজনের মাছ আছে তা জানা যায় না। এটা স্পষ্ট প্রতারণা। দ-বিধি ৪২০ ধারার অপরাধ। তাছাড়া জুয়া হিসেবে পরিচালিত এসব কর্মকা- শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়াউদ্দিন বলেছেন, ‘বড়শি প্রতিযোগিতা জুয়ার মধ্যেই পড়ে। কারণ সংশ্লিষ্ট পুকুর বা দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতা উপলক্ষে লাখ টাকায় সিট বেচাকেনা হয়। ২৪ ঘণ্টা বড়শি বেয়ে আপনি মাছ পান বা না পান সেটার জন্য আয়োজকরা দায়ী নন। অনেকেই আয়োজকদের পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক মাছ পান না। সংশ্লিষ্ট পুকুর বা দিঘিতে ৩০/৪০ কেজি ওজনের মাছ আছে বলে আয়োজকরা আগে থেকে ফেসবুকে কীভাবে প্রচার করেন। ফলে এ ধরনের প্রতিযোগিতা জুয়া। এটি দ-নীয় অপরাধ।’
আইনজ্ঞদের মতে, প্রকাশ্য জুয়া ১৮৬৭ সালের আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং দ-বিধির ২৯৪ ক ধারা মোতাবেক দ-নীয় অপরাধ হলেও একটি চক্র প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ করে’ অবলীলায় চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বড়শি প্রতিযোগিতার নামে জুয়ার আসর পরিচালনা করে আসছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বড়শি প্রতিযোগিতার নামে জুয়ার আসর পরিচালনা চক্রের প্রধান আবুল তালেব। চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী ডিটি রোডে ‘খালেক-মালেক বড়শির দোকান’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তিনি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দেশজুড়ে ভয়ংকর জুয়ার আসর পরিচালনা করছেন। তাদের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘চট্টলা ফিশিং’। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মৎস্য শিকারের নামে লাখ লাখ টাকার পুরস্কারের ফাঁদ তৈরি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তার সিন্ডিকেটে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সদস্য রয়েছে অন্তত ১৮ থেকে ২০ জন। বড়শি প্রতিযোগিতার নামে গড়ে ওঠা এ জুয়া চক্রের প্রধান আবু তালেবের বিরুদ্ধে সম্প্রতি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন স্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন চন্দনাইশ উপজেলার মো. সাহিদ নামের এক ব্যক্তি। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
আবুল তালেব সিন্ডিকেট ‘শৌখিন মৎস্য শিকারি সমিতি, টাঙ্গাইল’ ব্যানারে টাঙ্গাইল জেলা সদর লেকে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী বড়শি প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে আজ শুক্রবার। লেকে সর্বোচ্চ ৪০ কেজি ওজনের মাছ রয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। প্রতিটি টিকিটের মূল্য হচ্ছে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। আসন রাখা হয়েছে ১০১টি। এই হিসেবে টিকিট বিক্রি করে চক্রটি আয় করছে কোটি টাকার বেশি। প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার ২৫ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড। সর্বনিম্ন অষ্টম পুরস্কার ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড।
জানা গেছে, এই লেকে মাত্র ২৮ দিন আগে গত ১২ জুন বড়শি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ফেসবুক পেজ ‘চট্টলা ফিশিং’ টাঙ্গাইল লেকের বড়শি প্রতিযোগিতার লিফলেট প্রচার করা হচ্ছে। এতে বলা হচ্ছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন; সভাপতিত্ব করবেন টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শরীফা হক এবং উদ্বোধন করবেন টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থাকার বিষয়টি এ প্রতিবেদকের কাছ থেকে শুনে হতবাক হয়েছেন পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার। গতকাল দুপুরে দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। জেলা প্রশাসক শরীফা হকের মোবাইলে গতকাল দুপুরে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠালেও জবাব দেননি। প্রতিযোগিতার আয়োজক টাঙ্গাইলের ‘শৌখিন মৎস্য শিকারি সমিতি’-এর সাধারণ সম্পাদক মো. আজগর আলী চেয়ারম্যানের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলে তিনিও ফোন ধরেননি।
এদিকে, আবু তালেব চক্রের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের দোহাজারী পৌরসভা এলাকায় হাজারী দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতার নামে জুয়ার আসর বন্ধে গত ১৩ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমানের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগে বলা হয় ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি হাজারী দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে যৌথবাহিনী তা বন্ধ করে দেয়। এরপরও চক্রটি চলতি বছরের গত ১৯ জুন একই দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছে। প্রতিটি টিকিটের মূল্য ছিল ৬৫ হাজার টাকা। আসন সংখ্যা ছিল ভিআইপিসহ ৮৬টি। এই হিসেবে ৮৬টি আসনে লেনদেন হয় প্রায় ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে মৎস্য শিকারিরা কাক্সিক্ষত মাছ পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া একজন জানান, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা তার নেশা। ১৫ লাখ টাকা পুরস্কারের লোভে ধার করে ৬৫ হাজার টাকায় একটি টিকিট কেনেন। কিন্তু মাছ পেয়েছিলেন দুই কেজি ওজনের কাতলা ও রুই।
গত ৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা এলাকায় আয়োজন করা হয়েছিল বড়শি প্রতিযোগিতা। টিকিটের মূল্য ছিল ৭০ হাজার টাকা। আসন ছিল ভিআইপিসহ ৮৬টি। পুরস্কার ছিল ১৫টি। প্রথম পুরস্কার ছিল ১৫ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড।
একই চক্র ফেনীর ট্রাঙ্ক রোড এলাকার রাজাঝি’র দিঘিতে আগামী ১৭ জুলাই আয়োজন করেছে ‘আকর্ষণীয় বড়শি প্রতিযোগিতা-২০২৬’। এই প্রতিযোগিতায় ভিআইপিসহ আসন সংখ্যা ৮৭টি। প্রতিটি টিকিটের মূল্য ৭০ হাজার টাকা। প্রথম পুরস্কার ১৫ লাখ টাকার প্রাইজবন্ডসহ মোট ১৩টি পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এভাবে আলোচ্য চক্রটি বড়শি প্রতিযোগিতার নামে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে জুয়ার আসর পরিচালনা করে এলেও প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
বড়শি প্রতিযোগিতার নামে লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা এবং জুয়া পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে চক্রের প্রধান আবু তালেব গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো বড়শি প্রতিযোগিতার আয়োজক নই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুকুর ও দিঘিতে অনুষ্ঠেয় বড়শি প্রতিযোগিতার টিকিট বিক্রি করি মাত্র। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।’
উক্ত সিন্ডিকেটে চট্টগ্রামের নওশাদ করিম নামে আরও একজন সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। তিনি তার ফেসবুকে চক্রের প্রধান আবু তালেবের হয়ে বড়শি প্রতিযোগিতার প্রচার করে থাকেন।