দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতি ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ১০টি জেলায় এ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এসব এলাকা থেকে গতকাল শুক্রবার রাত ৮টা পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে বান্দরবানের সঙ্গে সরাসরি বাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলা সদরের সড়কে নৌকা চলছে, প্রত্যন্ত অঞ্চল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। আলীকদম উপজেলা তিন-চার দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল নেটওয়ার্কও বিঘিœত। এ জেলায় ২২০ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। রাঙ্গামাটিতে ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তিন দিন আটকে থাকার পর সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সাজেক ছাড়লেন সব পর্যটক। খাগড়াছড়ি পানছড়ির নালকাটা-শুকনাছড়ি সড়কের একাংশ ভাঙনে বিলীন হওয়ায় এ সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, সেখানে ৩ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
প্লাবিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফটিকছড়িতে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
পটুয়াখালীতে এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
গোপালগঞ্জে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। পটুয়াখালীতে এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। যশোরে ১০ ঘণ্টার বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর দুটি বাঁধ ভেঙে ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাইয়ের নদীর বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। বন্যায় ডুবে রাজনগর উপজেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশের পাঁচটি নদীর পানি ৯টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে বইছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্রের গতকাল নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবান পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপরে এবং চট্টগ্রামের দোহাজারি পয়েন্টে বিপদসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে মাতামুহুরী নদী বান্দরবানের লামা পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার ওপরে এবং কক্সবাজারের চিরিঙ্গা পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুশিয়ারা নদীর পানি সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপরে এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে মনু নদীর পানি মৌলভীবাজারের মনু রেল-ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপরে, মৌলভীবাজার পয়েন্টে বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া খোয়াই নদীর পানি হবিগঞ্জের বল্লা পয়েন্টে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের সব সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি : সৈকত দাশ জানান, বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। বান্দরবান-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢাকা এখনো সরাসরি বাস চালু হয়নি। বান্দরবান কেরানীহাট সড়কে এখনো পানি আছে।
এ জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাকবলিত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। প্লাবিত অঞ্চলগুলোতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়নি।
বান্দরবান সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগর, ওয়াপদা ব্রিজ এলাকা, বনানী স’মিল এলাকা, ইসলামপুর, ব্রিগেড এলাকা, সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকা, ক্যাচিংঘাটাসহ বেশ কিছু এলাকায় এখনো বন্যার পানি আছে। বালাঘাটা সড়কের ওপর নৌকা দিয়ে মানুষ পার হচ্ছে। সদরের আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগরসহ আরও বেশ কিছু এলাকার সড়কের ওপর দিয়ে নৌকা চলছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জনজীবন এখনো স্বাভাবিক হয়নি। নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নের থুইলা অং পাড়ায় মধ্যম গর্জনখালের ওপর নির্মিত পাকা ব্রিজটি পাহাড়ি ঢলে ধসে পড়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রুমা ও রোয়াংছড়িতে বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
আলীকদম উপজেলা তিন-চার দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে থানচি উপজেলার ৫ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত টেলিটকের কোনো নেটওয়ার্ক ছিল না। এখনো রবির নেটওয়ার্ক নেই।
আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী। তিনি জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য তালিকা করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
বাঘাইছড়িতে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, সাজেক ছাড়লেন সব পর্যটক : শংকর হোড় জানান, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় টানা ভারী বর্ষণের পরিমাণ কিছুটা কমে এলেও জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো ৩০টি গ্রামে দেড় হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় অতিবর্ষণের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজার ৫২৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে বাঘাইছড়িতে ১৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে এক হাজার ৫৩৮ জন বন্যার্ত মানুষ অবস্থান করছেন। দুর্যোগের কারণে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলায় ১২৫টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের এখনো নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসতে প্রশাসন থেকে বারবার মাইকিং করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তিন বেলা খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।
রাঙ্গামাটি সাজেকে আটকা পড়া চারশ পর্যটক সেনা সহায়তায় নিজ গন্তব্যে ফিরে গেছে। তিন দিন আটকে থাকার পর গতকাল শুক্রবার সকালে সেনাবাহিনীর স্কটে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় পর্যটকবাহী জিপ, মোটরসাইকেল।
টানা কয়েকদিনের বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদে বেড়েছে পানি। এতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বেড়েছে। তিন দিনের ব্যবধানে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে।
খাগড়াছড়িতে পানছড়ির নালকাটা-শুকনাছড়ি সড়কের একাংশ বিলীন : রূপায়ন তালুকদার জানান, টানা চার থেকে পাঁচ দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে জেলাপানছড়ি উপজেলার নালকাটা-শুকনাছড়ি সড়কের একটি বড় অংশ শুকনাছড়ি ছড়ার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে উপজেলার ৪ নম্বর লতিবান ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা নাসরিন। তিনি জানান, সড়কটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে মেরামত কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এখনো ছড়ায় তীব্র স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। বিকল্প কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পরিস্থিতির অবনতি, ৩ শিশুর মৃত্যু : কল্যাণ বড়ুয়া জানান, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতির মাঝে শুক্রবার সকালে পৃথক ঘটনায় পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামে প্রবাসী মোহাম্মদ কামালের ৮ বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ আশিক বাড়ির উঠানে থইথই পানির তীব্র স্রোতে ভেসে যায়। পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজির পর তাকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় গুনাগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বাহারছড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রতœপুর এলাকায় শিশু মোহাম্মদ মিরাজ (৬) অসাবধানতাবশত বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পশ্চিম জালিয়াঘাটা এলাকায় পা পিছলে বিলে পড়ে নিখোঁজ হয় আব্দুল করিমের কন্যা তাহিন নুর (১২)। বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস দীর্ঘ সময় পানি ভর্তি সারা বিলে তল্লাশি চালিয়ে সন্ধ্যায় লাশ উদ্ধার করে।
শুক্রবার সকালে জামায়াতে ইসলামীর আমির জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. শফিকুর রহমান বাঁশখালী বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বাঁশখালীকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান।
বাঁশখালীর টিএনও মো. রুহুল আমিন জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বাঁশখালীর উপকূলীয় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ৭০০ থেকে ৮০০ লোক অবস্থান করছে।
ফটিকছড়িতে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ চরমে : সাইফুর রহমান সোহান জানান, গত দুই দিনের বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘর, আঙিনা, সড়ক ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ উপজেলায় ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে। বন্যায় পানিবন্দি পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা তুলে দিচ্ছে সেনাবাহিনী।
সড়ক তালিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে নাজিরহাট-কাজিরহাট সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাঁটুসমান পানি জমে আছে।
গোপালগঞ্জে জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগে জনজীবন : জেলা প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণে গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমেছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া অবিরাম বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। অনেক এলাকায় বাড়ির উঠান ও প্রবেশপথ পানিতে ডুবে যাওয়ায় বাসিন্দাদের ঘর থেকে বের হতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নিচু এলাকার বেশ কয়েকটি দোকানেও পানি প্রবেশ করায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ভোগ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
পটুয়াখালীতে এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি, জনজীবনে ভোগান্তি : আরিফ সুমন জানান, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্যের প্রভাবে পটুয়াখালীতে গত এক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার কলাপাড়ায় ৬৮.০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে খেপুপাড়া আবহাওয়া অফিস। এতে অনেকটা স্থবিরতা নেমে এসেছে। টানা বৃষ্টিতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নিচু এলাকার অনেক পরিবার।
হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর দুটি বাঁধ ভেঙে ২০ গ্রাম প্লাবিত : শোয়েব চৌধুরী জানান, কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে খোয়াই নদী। বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। গবাদিপশু ও আসবাবপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছেন বন্যাদুর্গতরা।
চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজারসংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙন আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। চরম ঝুঁকিতে রয়েছে খোয়াই নদীর মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষাবাঁধ। স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত বাঁধ রক্ষায় কাজ করছেন। তারা বাঁশ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে গেছে। যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সকালে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও সন্ধ্যার দিকে পানি কমতে থাকে।
হবিগঞ্জ সদরের টিএনও আব্দুল্লাহ আবু জাহের জানান, বন্যাদুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠার জন্য বলা হয়েছে। বন্যার পরিস্থিতি তদারকি করতে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে।
মৌলভীবাজারে বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি প্রায় ৩০ হাজার মানুষ : রুহুল ইসলাম হৃদয় জানান, জেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার প্রধান দুই নদী মনু ও ধলাইয়ের একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলার সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার অন্তত ১৭টি ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার পরিবারের ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় ডুবে রাজনগর উপজেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজনগরে মো. আশরাফ মিয়া নামে এক বৃদ্ধের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করেন স্বজনরা।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা। মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম এবং ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে আরও প্রায় ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
ধলাই নদীর বাঁধে বড় ভাঙন দেখা দেওয়ায় আরেক উপজেলা কমলগঞ্জের ইসলামপুর, আদমপুর ও মাধবপুর ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ৩টি প্রাথমিক ও ১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে শুক্রবার বিকেলে ওই এলাকার সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান ত্রাণ বিতরণ করেন।
ইতিমধ্যে ৯৫টি পরিবারকে মাইজগাঁও দাখিল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলিদ বলেন, মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের আরও ৪-৫টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য জেলার ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
যশোরে ১০ ঘণ্টার বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, চরম ভোগান্তি : তবিবর রহমান জানান, যশোরে টানা ১০ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতে নিম্নাঞ্চলে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। যশোর শহর, শহরতলীসহ গোটা জেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। শহরের অধিকাংশ এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
যশোর বিমানবাহিনীর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১০ ঘণ্টায় মোট ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
যশোর শহর ঘুরে দেখা গেছে, শহরের প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার রাস্তাগুলো এখন পানির নিচে। অনেক সড়কে হাঁটু পানি হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানিতে মানুষকে মাছ ধরতেও দেখা গেছে। বৃষ্টির পানি নামতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে এবং কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
শহরের খড়কি এলাকার বাসিন্দা আজগর আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ড্রেনগুলো অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি : মানিক মজুমদার জানান, টানা পাঁচ দিনের বর্ষণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জোয়ারের পানির সঙ্গে ভারী বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও হাট-বাজার তলিয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। রান্নাঘরের চুলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। বিস্তীর্ণ এলাকার আমনের বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। শত শত মাছের ঘের ও পুকুরের পাড় উপচে মাছ ভেসে গেছে।
নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না।