পাহাড়ধসে মৃত্যু থামছে না

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৩ এএম

বর্ষায় বৃষ্টি হবে, সেই বৃষ্টিতে বালি মাটির পাহাড় ধসেও পড়বে। কিন্তু মৃত্যু ঠেকাতে পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযান, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ নানা কর্মসূচি নেওয়া হলেও সব কিছুকে ভুল প্রমাণ করে বছরের পর বছর পাহাড় ও দেওয়ালধসে মানুষের মৃত্যু ঘটছেই। ২০০৭ সালের ১১ জুন  চট্টগ্রামে পাহাড় ও দেওয়ালধসে ১৩২ জনের প্রাণহানির পর ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙ্গামাটিতে একদিনে ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বছরই কম-বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আর এই মৃত্যুতে সাম্প্রতিক সময়ে এগিয়ে আছে কক্সবাজার। পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠায় ২০১৭ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে একটি স্পটেই। এ বছরও কক্সবাজারে গত তিন দিনে ১৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা  ঘটেছে রোহিঙ্গা বসতিতে।

পাহাড়ধস নিয়ে গবেষণারত বিভিন্ন গবেষক ও জেলা প্রশাসনগুলো থেকে প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ জুন থেকে গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২১৩ জন, রাঙ্গামাটিতে ১৩৫ জন, বান্দরবানে ১১০ ও কক্সবাজারে ৩৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিগত ১৯ বছরে পাহাড় ও দেওয়ালধসে মৃত্যুর সংখ্যা যা ৯৯৬ জনে গিয়ে ঠেকেছে। কক্সবাজার ছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি কিংবা বান্দরবান জেলায় পাহাড়ধসে মৃত্যুর হার কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু কক্সবাজারে এই হার কমার কোনো লক্ষণ নেই। ২০১৭ সালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা বসতি শুরু হওয়ার পর ওই বছরই ২৬ জন, ২০১৮ সালে ২৮ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ২৯, ২০২২ সালে ২৫, ২০২৩ সালে ৬ ও ২০২৪ সালে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অন্যদিকে এই সময়ের মধ্যে শুধু ২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুনের প্রবল বর্ষণে রাঙ্গামাটিতে ১২০ জন, বান্দরবানে সাতজন ও চট্টগ্রামে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে চট্টগ্রামে মারা গিয়েছিল চারজন। অন্যদিকে এ বছর গত চার দিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রামে চারজন, কক্সবাজারে ২০ জন, বান্দরবানে পাঁচজন ও রাঙ্গামাটিতে একজনের মৃত্যু হয়।

এবার মৃত্যু বেড়ে গেল কেন?

চট্টগ্রাম বিভাগে শক্তিশালী পাহাড়ধস ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. মো. জিয়াউদ্দীন। দেশ রূপান্তরের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির আওতায় বিভাগের কোথাও পাহাড় কাটা যাবে না মর্মে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসায় কিন্তু পাহাড়ধসে মৃত্যুও কমে এসেছে। আগে চট্টগ্রামেই প্রতি বছর মৃত্যুর ঘটনা ঘটত। এখন কিন্তু মৃত্যুর তেমন ঘটনা ঘটছে না। তবে পাহাড়ধস হচ্ছে কিন্তু মানুষ মারা পড়ছে না।

তাহলে কক্সবাজারে কেন মারা পড়ছে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কক্সবাজারে পাহাড়ি এলাকার মধ্যে রোহিঙ্গাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই অন্য কোনো স্থানে তাদের আশ্রয় দেওয়ার সুযোগও নেই। তারা অবাধে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণের কারণেই কিন্তু বর্ষায় পাহাড় ধসে মারা পড়ছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা বসতিতে মৃত্যুর একটি উপাত্ত দিয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘এ বছর কক্সবাজারের ২০ জনের মধ্যে ১৭ জনই রোহিঙ্গা বসতিতে মৃত্যু হয়েছে। তাহলে সহজেই বুঝা যাচ্ছে কেন মারা যাচ্ছে।’

পাহাড়ধসে কিন্তু পাহাড়িরা মারা পড়ছে না

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, পাহাড়ধসে কিন্তু পাহাড়িরা মারা যাচ্ছে না। পাহাড়িরা জানে কোন পাহাড়টি ধসে পড়বে আর কোনটি পড়বে না। তাই সেই হিসেবে কিন্তু তারা বসতি স্থাপন করে। সমতল থেকে পাহাড়ে বসতি স্থাপন করতে গিয়ে মারা পড়ছে মানুষ।

বিভাগীয় কমিশনারের এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, ‘বান্দরবানের থানছি, রোয়াংছড়ি ও আলীকদম এসব এলাকার পাহাড়গুলো কিন্তু পাথুরে। অন্যান্য এলাকার পাহাড়গুলোয় বালি মাটির আধিক্য বেশি থাকে। পাহাড়ে যেসব আদিবাসী পাহাড়ি বসবাস করে, তারা কিন্তু জানে কোন পাহাড়টি বৃষ্টিতে ধসে পড়তে পারে ও কোনটি পড়বে না। সে হিসেবেই পাহাড়ে বসতি স্থাপন করে তারা। কিন্তু সমতলের যারা পাহাড়ে গিয়ে বসতি স্থাপন করে, তারা পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য জানে না এবং একসময় পাহাড়ধসে মারা যায়।’

কেন থামছে না মৃত্যু

২০০৭ সালের ১১ জুনের ঘটনার পর মৃত্যু ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি অনেকগুলো তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেসব কমিটি রিপোর্টও প্রদান করে। প্রতি বছর সেই কমিটি সমন্বয় সভাও করে। সেসব সভায় পাহাড়ে বসতিদের বসবাস করতে নিরুৎসাহিত করতে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা বলা হয়। বর্ষা মৌসুম এলেই মাইকিং করা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু তারপরও থামছে না মৃত্যু। এর কারণ জানতে চাইলে পাহাড় রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা পরিবেশর্কমী শরীফ চৌহান বলেন, ‘বৃষ্টি হবে এবং সেই বৃষ্টিতে পাহাড় ধস হবেই। এটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই ধস ঠেকাতে এবং মৃত্যু ঠেকাতে তদন্ত কমিটি অনেকগুলো সুপারিশ করেছিল। সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বারবার মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পাহাড়ধসে মৃত্যু প্রসঙ্গে বলেন, পাহাড়ের পাদদেশের বসতিদের আমরা উচ্ছেদ করে আসি। কিন্তু তারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চায় না, আবার এলেও পরে আবার চলে যায় এবং টানা বর্ষণে পাহাড়ধস হলে মারা যায়।

অন্যদিকে একই বক্তব্য দেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া। তিনিও মিডিয়াকে বলেন, আমাদের জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রবল বর্ষণের মধ্যেও পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরে আসতে মাইকিং করে। অনেক সময় তাদেরকে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরিয়ে এনে আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হয়। কিন্তু তারা আবারও সেখানে চলে যায়। তারপরও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

টানা বৃষ্টি পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ায়

চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো বালি মাটির পাহাড়। তাই টানা বর্ষণ হলে এসব মাটি ভিজে গলে যায়। এতে পাহাড়ধসের মতো ঘটনা ঘটে। এই পাহাড়ধসকে আরও বাড়িয়ে দেয় পাহাড় কাটা কার্যক্রম। পাহাড়গুলো খাড়া করে কাটার কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। দেশের পাহাড়ধস নিয়ে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মো. ইকবাল সরোয়ার। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে কিন্তু পাহাড়িরা মারা পড়ছে না। আমি আমার গবেষণায় দেখেছি, আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো যেসব পাহাড়ে বসবাস করে কিংবা জুম চাষ করে, সেগুলো কিন্তু ধসে পড়েনি। সমতল থেকে যাওয়া মানুষগুলো পাহাড়ের চরিত্র না বুঝে ব্যবহারের কারণেই পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে।’

তিনি আরও বলেন, বালি মাটির পাহাড় হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবেই টানা বৃষ্টি হলে পাহাড় ধসে পড়তে পারে। আর এই ধসে পড়াকে ত্বরান্বিত করেছে পাহাড় কাটা কার্যক্রম।

পাহাড় কাটা বিষয়ে কথা হয় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে অবাধে পাহাড় কর্তন। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলেও থেমে নেই পাহাড় কাটা। পাহাড়গুলো খাড়া করে কাটার কারণে টানা বৃষ্টিতে এসব পাহাড় ধসে পড়ে এবং জানমালের ক্ষতি হয়।’ এদিকে এ বছর গত চার দিনে চট্টগ্রামে ৮৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। টানা বর্ষণের কারণে বালি মাটির এসব পাহাড়ের মাটি সরে গিয়েও পাহাড়ধস হচ্ছে।

বাস্তবায়ন হয় না সুপারিশ

২০০৭ সালের ঘটনার পরপরই তৎকালীন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) এমএএন ছিদ্দিককে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটি ১৮ পাতার তদন্ত রিপোর্টে পাহাড় ধসের ২৮ কারণ চিহ্নিত করে ৩৬ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলামকে প্রধান করে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ‘পাহাড়ধস ও ভূমিধসের কারণ উদঘাটন ও ঝুঁকির মাত্রা কমানোর ওপর সুপারিশ প্রণয়ন’ শীর্ষক সেই রিপোর্টে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি তিন ধরনের সুপারিশ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর মোজাম্মেল হককে প্রধান করে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিও পাহাড় না কাটা, পাহাড়গুলোর ঢাল ৩৫ ডিগ্রিতে রাখা, পাহাড়ে বৃক্ষ রোপণ করা, পাহাড়ের মালিকদের নিজ উদ্যোগে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করাসহ অনেকগুলো সুপারিশ দিয়েছিল। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হচ্ছে না বলে অনেকের মত।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামসহ দেশের পাহাড়ি এলাকাগুলোয় বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের পার্বত্য জেলাসমূহ ছাড়াও সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত