বিশ্বকাপের সমীকরণ আগে থেকেই কষা গ্রুপসেরা হয়ে এগোতে থাকলে সেমিফাইনালে দেখা হবে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের। শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে সেদিন মিসরকে ৩-২ ব্যবধানে হারানোর পর আর্জেন্টিনা যখন বুঝতে পারল সামনেই আসছে ইংল্যান্ড, কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষকে একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিল যেন! ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে বুয়েনস আইরেসের রাস্তা সবখানেই তখন শুধু একটাই কথা, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে পাচ্ছে তারা।
সেই রাতে আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে যে উদযাপনের ঝড় উঠেছিল, তা শুধু জয়ের আনন্দ ছিল না, ছিল চিরশত্রুদের উদ্দেশ্যে এক খোলামেলা যুদ্ধংদেহী বার্তা। বিখ্যাত ফ্যান-অ্যান্থেম ‘মুচাচোস’ এবং নতুন গান ‘লা কুয়ার্তা এস্ত্রেয়া’ (চতুর্থ তারকা) গেয়ে ড্রেসিংরুমে মেতে ওঠেন মেসি-এনজোরা। তাদের উচ্চকণ্ঠে গাওয়া গানে উঠে আসে ১৯৮২ সালের ঐতিহাসিক ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ক্ষতের কথা। যুদ্ধে অংশ নেওয়া তরুণ শহীদদের আবেগঘন স্মরণের পাশাপাশি দ্বীপপুঞ্জটিকে নিজেদের দাবি করে সরাসরি ইংল্যান্ডকে খোঁচা দেয় পুরো দল ‘ইংলিশরা আর একটুখানি ধৈর্য ধরো, আমাদের খুব শিগগিরই দেখা হচ্ছে।’
এই যুদ্ধংদেহী উদযাপনের কারণ ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের বহু পুরনো লড়াই। ইংল্যান্ড ১৯৬৬-এর বিশ্বকাপ জেতার পথে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। ২০ বছর পর ১৯৮৬-তে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার আলোচিত-সমালোচিত হ্যান্ড অব গড ও শতাব্দীর সেরা গোলে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর। তাই দুটো দলের যখন বিশ্বকাপে আবার মুখোমুখি হতে যাওয়ার সম্ভাবনা জেগেছে, তাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠা স্বাভাবিক।
তবে এই লড়াইয়ে যাওয়া নিশ্চিত করতে আজ নিজেদের কোয়ার্টার ফাইনাল জিততে হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডকে। ইংল্যান্ডকে আজ রাতে হারাতে হবে নরওয়েকে। আর বাংলাদেশ সময় রবিবার সকাল ৭টার ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে জিততে হবে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে।
আর্জেন্টিনার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আকাক্সক্ষার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে তাদের চরম ‘মেসি-নির্ভরতা’। ৩৯ বছর বয়সী অধিনায়ক লিওনেল মেসি চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ১৪ গোলের মধ্যে ৮টিই নিজে করেছেন।
মেসি যখন অতিমানবীয় ফর্মে, তখন হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজদের ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। আনহেল ডি মারিয়ার অবসরের পর দুই প্রান্তের ধার কমে যাওয়ায় মাঝমাঠের পুরো চাপ এসে পড়ছে বক্সে। আলভারেজকে মেসির হয়ে অতিরিক্ত ট্র্যাক-ব্যাক ও প্রেসিং করতে হচ্ছে, যার ফলে ফিনিশিং জোনে গিয়ে গোল করার সুযোগ ও আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
আর্জেন্টিনার ডিফেন্স এখনো বেশ নড়বড়ে। প্রতিপক্ষ চলতি আসরে মাত্র ৯টি শট অন-টার্গেট করতে পেরেছে, যার ৫টিই গোল হয়েছে! লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোরা আক্রমণভাগে গোল করলেও কাউন্টার অ্যাটাক ঠেকানোর ক্ষেত্রে পজিশন হারাচ্ছেন।
আর্জেন্টিনা যখন সেমিফাইনাল নিয়ে রোমাঞ্চিত, সুইসরা তখন ইতিহাস ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর। কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে বিদায় করে দীর্ঘ ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে তারা। মুরাত ইয়াকিনের দল শেষ ১৯ ম্যাচের মাত্র ১টিতে হেরেছে। আরও ভীতি জাগানিয়া পরিসংখ্যান হলো এই ২০২৬ বিশ্বকাপ চক্রের (বাছাই পর্ব ও মূল আসর মিলিয়ে) এক মিনিটের জন্যও কোনো ম্যাচে সুইজারল্যান্ড কখনো পিছিয়ে পড়েনি! এই জমাট সুইসপ্রাচীর ভাঙা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের জন্য হবে এক বড় পরীক্ষা।
কোচ লিওনেল স্কালোনি তার ৮ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে (১০১ ম্যাচে মাত্র ৩ বার) একাদশ অপরিবর্তিত রাখার যে অলিখিত নিয়ম তৈরি করেছিলেন, সুইসদের বিপক্ষে তিনি তা ভাঙতে চলেছেন। মিসর ম্যাচের রূপকথা ফিরিয়ে আনা উইনিং কম্বিনেশনটাই তিনি মাঠে নামানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
দুদলের ৭ বারের দেখায় সুইজারল্যান্ড কখনো আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারেনি (৫ জয় আর্জেন্টিনার, ২ ড্র)। বিশ্বকাপে দুদলের শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৪ সালে, যেখানে অতিরিক্ত সময়ের ১১৮ মিনিটে মেসির পাস থেকে ডি মারিয়ার জাদুকরী গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
তবে আর্জেন্টিনার সামনে এবার ইতিহাসের ৩টি কঠিন ‘অভিশাপ’ দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত যে দলই সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জিতেছে বা ড্র করেছে, তারা কেউ-ই সেই আসরে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি (ব্যতিক্রম ২০১০-এর স্পেন, তবে তারা সুইসদের কাছে হেরেছিল)। আর ফুটবল ইতিহাসে টানা ৪টি মেজর ট্রফি (কোপা, বিশ্বকাপ, কোপা, বিশ্বকাপ) জেতার নজির আর কারও নেই। আর ১৯৬২ সালে পেলের ব্রাজিলের পর গত ৬৪ বছর ধরে পৃথিবীর কোনো ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন তাদের ট্রফি ধরে রাখতে পারেনি।
মাঠের ফুটবলে অতি-আত্মবিশ্বাস ও আগাম উদযাপনই কাল হতে পারে আর্জেন্টিনার, যদি না তারা সুইজারল্যান্ডের দুর্ভেদ্য ডিফেন্সকে ভাঙতে পারে। যে সুইজারল্যান্ড পুরো বিশ্বকাপ চক্রে এক সেকেন্ডের জন্যও পিছিয়ে পড়েনি, তাদের অবহেলা করলে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগেই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্বপ্নও মাঝপথে ভেঙে পড়তে পারে!