কাতার বিশ্বকাপের সেই চেনা সেমিফাইনালের চিত্রনাট্য যেন হুবহু ফিরে এলো উত্তর আমেরিকাতেও। মরক্কোর রক্ষণভাগ ভেঙে আরও একবার ২-০ ব্যবধানের জয়ে বিশ্বকাপের শেষ চারে পা রেখেছে বর্তমান রানার্স-আপ ফ্রান্স। তবে চার বছর আগের সেই চেনা রক্ষণাত্মক খোলস ভেঙে দিদিয়ের দেশমের দল এবার খেলেছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার ‘ফ্রি-ফর্ম’ আক্রমণাত্মক ফুটবল। কাতারে যেখানে মরক্কোর আক্রমণ সামলাতে ফ্রান্সের ঘাম ছুটেছিল, এবার শুরু থেকেই ফরাসিদের তীব্র হাই-প্রেসিং ফুটবলের সামনে উত্তর আফ্রিকার দলটি কেবল নিজেদের রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। প্রথমার্ধের পুরোটা সময়ে ফরাসিদের একের পর এক আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল মরক্কো।
তবে বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে টানা
তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিতের পর যখন ফরাসি সমর্থকদের মধ্যে উল্লাস, ঠিক তখনই মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে এই আত্মতুষ্টির আবহ এক ঝটকায় মাটিতে নামিয়ে আনলেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। যেন মনে করিয়ে দিলেন, শেষ চারে ওঠার স্বস্তি থাকলেও কাপ ধরে রাখার মিশনে ফরাসিদের আসল
অগ্নিপরীক্ষা কেবল শুরু হলো, প্যারিস এখনো অনেক দূরে। নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও দলের মানসিকতা স্পষ্ট করে ফরাসি সুপারস্টার বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। তবে আমরা এটাও জানি যে, একমাত্র ট্রফি জয়ের মাধ্যমেই স্বস্তি পাওয়া সম্ভব। এখনো আমাদের অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। আমরা জানি যে সামনে আমাদের জন্য যা অপেক্ষা করছে, তা এ পর্যন্ত আমরা যা পার করে এসেছি তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।’
মাঠের লড়াইয়ে মরক্কো হয়তো ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের হারের প্রতিশোধ নেওয়ার স্পষ্ট পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা নিয়েই মাঠে নেমেছিল। কিন্তু দিদিয়ের দেশমের দলের বর্তমানের হাই-প্রেসিং ফুটবলের সামনে প্রথম থেকেই মরক্কো কেবল নিজেদের রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। প্রথমার্ধের পুরোটা সময়ে ফরাসিদের একের পর এক আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে উত্তর আফ্রিকার দলটি। ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিটে মরক্কো যখন গোলমুখে একটি শট নেওয়ার জন্যও হাঁসফাঁস করছিল, তখন ফ্রান্স তৈরি করেছিল ১৩টি সুবর্ণ সুযোগ।
ম্যাচের ২৭ মিনিটে বক্সের ভেতর আশরাফ হাকিমিকে বোকা বানিয়ে দেসিরে দুয়ে বল বাড়িয়ে দেন মাইকেল অলিসকে। সেখানে অলিসের পাস থেকে বল পেয়ে বক্সে ঢোকার মুখে নুসাইর মাজরাউইয়ের ফাউলের শিকার হন এমবাপ্পে। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালেও এক চরম নাটকীয়তা ও ভিএআর-এর দীর্ঘ টানাপড়েনে ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড নষ্ট হয়, যা ফরাসি অধিনায়কের মনোযোগ পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। পুরো ঘটনা বর্ণনা করে এমবাপ্পে বলেন, ‘আমি ভালো শট নিতে পারিনি, সেটা স্বীকার করছি। কিন্তু সেখানে মাঠের ভেতর চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। রেফারি আমাকে প্রথমে বললেন এটা পেনাল্টি। আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করলামÑ ভিএআর রিভিউ কি শেষ? তিনি বললেন, হ্যাঁ শেষ। কিন্তু আমি যখনই পেনাল্টিতে ফোকাস করা শুরু করেছি, ও ঠিক তখনই আমার কাছে এসে বলল, অপেক্ষা করো। কারণ তিনি নাকি দুই মিনিট আগের অন্য একটি প্লে রিভিউ করে দেখছেন! মাঠের ভেতরের এই অদ্ভুত পরিস্থিতি আগে আমি কখনো দেখিনি। এই দীর্ঘ অপেক্ষার মানসিক চাপেই হয়তো এমবাপ্পের নেওয়া দুর্বল শটটি বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন মরক্কোর পেনাল্টি স্পেশালিস্ট গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনু। এরপর দায়ো উপামেকানোর হেড ও দুয়ের মাটি কামড়ানো শট বোনু আটকে দেওয়ার পর লুকাস দিগনের শট বারে লাগলে প্রথমার্ধে আর গোল পায়নি ফ্রান্স।
আক্রমণে সক্রিয় থাকলেও বিরতির পরও ফিনিশিংয়ের ছন্দহীনতায় ভুগছিল ফ্রান্স। এমবাপ্পে নিজেও একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বিবেচনায় যেন এটাই বলে, তাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখা অসম্ভব। ম্যাচের ৬০ মিনিটে বোনুর একটি দুর্বল ক্লিয়ারেন্স বুক দিয়ে নামিয়ে বক্সে এমবাপ্পের উদ্দেশ্যে বাড়ান দিগন। সেখানে গোল করার ২৫ শতাংশ সুযোগও ছিল না। সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ডিফেন্ডার ইসা দিওপ। এমবাপ্পে দিওপকে আড়াল (শিল্ড) হিসেবে ব্যবহার করে ডান পায়ের এক অতিমানবীয় জাদুকরী বাঁকানো শটে ৯৮ কিলোমিটার গতিতে বল জালে জড়ান। আর এতেই ১৯৬৬ সালের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোলে সরাসরি যুক্ত থাকার (গোল ইনভলভমেন্ট) অতিমানবীয় রেকর্ড গড়েন এমবাপ্পে।
মরক্কোর প্রাথমিক প্রতিরোধ ভাঙার ঠিক ৬ মিনিট পর অর্থাৎ ৬৬ মিনিটে উসমান দেম্বেলে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। এবারও মাজরাউইকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে বক্সের কোণ থেকে কোনাকুনি নিচু শট নেন দেম্বেলে, বোনু হাত ছোঁয়ালেও বল জালে জড়ানো আটকাতে পারেননি।
পেনাল্টি মিস বা প্রথমার্ধের ব্যর্থতা নিয়ে ফরাসি শিবিরে অবশ্য কোনো সংশয় ছিল না। কোচ দিদিয়ের দেশম দলের অটুট বিশ্বাসের কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের প্রথমার্ধে কার্যকারিতার অভাব ছিল এবং পেনাল্টি মিসসহ বেশ কিছু সুযোগ নষ্ট হয়েছিল। কিন্তু দলের মনে কখনোই কোনো সন্দেহ তৈরি হয়নি, বিশেষ করে কিলিয়ানের মনে তো নয়ই। আমরা ওদের দমিয়ে রাখার জন্য সবকিছু ঠিকঠাক করেছি।’
অন্যদিকে মরক্কোর কোচ মোহামেদ ওয়াহবি হারের গ্লানি মেনে নিয়ে অকপটে বলেন, ‘আমাদের মাথা উঁচু রাখতে হবে কারণ আমরা আমাদের সেরাটা দিয়েছি। তবে আমাদের এটা স্বীকার করতেই হবে যে আজ ফ্রান্স আমাদের চেয়ে অনেক ভালো দল ছিল। আমাদের উইং ও সেন্টারে ওরা চরম ভুগিয়েছে।’
তবে সেমিফাইনালে ওঠার স্বস্তি থাকলেও ফ্রান্সের আসল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে এখন থেকেই। আগামী মঙ্গলবার টেক্সাসের ডালাসে সেমিফাইনালে তাদের লড়তে হবে স্পেন অথবা বেলজিয়ামের বিপক্ষে। পরিসংখ্যান বলছে, শেষ চারের এই পথটা ফরাসিদের জন্য মোটেও মসৃণ নয়। সেমিতে প্রতিপক্ষ হিসেবে বেলজিয়াম এলে শেষ ৫ ম্যাচের জয়ের অতীত ফ্রান্সকে আত্মবিশ্বাস দেবে ঠিকই, কিন্তু দুই দলের সামগ্রিক ৭৫ বারের মুখোমুখি লড়াইয়ে ৩০টি জিতে এগিয়ে আছে বেলজিয়ামই (ফ্রান্সের জয় ২৬, ড্র ১৯)। আর প্রতিপক্ষ যদি হয় স্পেন, তবে পরীক্ষাটা হবে আরও কঠিন। কারণ বড় মঞ্চে স্প্যানিশরা ফরাসিদের জন্য সবসময়ই বড় জুজু; ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনাল কিংবা ২০১২ ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালÑ সবখানেই ফ্রান্সকে বিদায় নিতে হয়েছিল এই স্পেনের কাছেই।