চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ৭ লাখ মানুষ, ১১ মৃত্যু

টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো চট্টগ্রাম জেলা। স্মরণকালের এই দুর্যোগে জেলার ১৬টি উপজেলা ও মহানগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় এ পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়া ২৩ হাজার ৮৫০ জন মানুষ ইতিমধ্যে আশ্রয় নিয়েছেন জেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। আকস্মিক এই ঢলে শুধু ঘরবাড়িই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী জেলার সাড়ে ৭ হাজার মৎস্য জলাশয় ভেসে গেছে এবং তলিয়ে গেছে ১৩ হাজার ৬৩৪ হেক্টর ফসলি জমি। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের থাবায় সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭ লাখ  ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ। টানা কয়েকদিনের বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, সীতাকু-, মিরসরাই, সন্দ্বীপসহ ১৬টি উপজেলা এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব উপজেলার মোট ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এখন পানির নিচে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট, ফসলি জমি এবং মাছের ঘের ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫০ জন মানুষ। আশ্রয় নেওয়া দুর্গত মানুষরা জানান, আকস্মিক ঢলে ঘরের আসবাবপত্র ও গবাদিপশু রক্ষার সুযোগ পাননি তারা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বানভাসিরা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ৭০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যেই ৩০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৪৩ লাখ টাকা মাঠপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে।

শুকনো ও রান্না করা খাবারের সংকট দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৯ হাজার ৮৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের জরুরি তহবিলে আরও ৪০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১৭ লাখ টাকা নগদ মজুদ রয়েছে।

৭ শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু : চলমান এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলায় এখন পর্যন্ত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে বাঁশখালীতে তিনজন, চট্টগ্রাম মহানগরে দুইজন, রাউজানে একজন, রাঙ্গুনিয়ায় একজন, হাটহাজারীতে একজন, আনোয়ারায় একজন, সীতাকু-ে একজন ও সাতকানিয়ায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া অতি বর্ষণজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০ জন মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে চারজন পানিতে ডুবে, তিনজন পাহাড়ধসে, একজন দেওয়ালচাপায়, একজন পানির স্রোতে ভেসে মারা গেছেন। অপরজনের মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি।

ভেসে গেছে সাড়ে ৭ হাজার জলাশয় : বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চট্টগ্রামের মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার ১৫টি উপজেলার প্রায় ৭ হাজার ৩৭৫টি পুকুর-দিঘি এবং ৪৫টি চিংড়ি ঘেরসহ মোট ৭ হাজার ৪২০টি জলাশয় ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। এতে বাণিজ্যিক ও ব্যক্তি মালিকানাধীন খামারগুলো থেকে ১ হাজার ৮০৫ টন মাছ এবং ৪৮ লাখ ৪০ হাজার পোনামাছ পুরোপুরি ভেসে গেছে।

প্রাথমিকভাবে এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলেও পানি সম্পূর্ণ নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম।

১৩ হাজার হেক্টরের বেশি ফসলি জমি আক্রান্ত : টানা অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামের কৃষি খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। কৃষি বিভাগের ৬ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত প্রাপ্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলাজুড়ে মোট ১৩ হাজার ৬৩৪ হেক্টর দ-ায়মান ফসলি জমি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধানের। মাঠে থাকা ৩১ হাজার ৫৩৩ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ৮ হাজার ৩১ হেক্টর জমি বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২০ হাজার ৫৪৮ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ৪ হাজার ৬৭৭ হেক্টর এবং ৩ হাজার ৫০৪ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৮১০ হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

পাশাপাশি পানের বরজও এই দুর্যোগ থেকে রেহাই পায়নি; চাষ করা ৩ হাজার ৬৫ হেক্টর বরজের মধ্যে ১১৬ হেক্টর পান বরজ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান জানান, পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার এবং তাদের কাছে শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়াকে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫০ জন মানুষ। আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ ও খাবার পৌঁছে দিচ্ছি।