‘ভাতিজা জ্বর জ্বর লাগছে। সর্দি কাশি আছে। ওষুধ দাও’। বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার সাইনবোর্ড বাজারের একটি ওষুধের ফার্মেসিতে এভাবেই ওষুধ চাইলেন এক মুরব্বি। বয়স আনুমানিক ষাটের বেশি হবে। ওই ফার্মেসির ব্যক্তিও তাকে কয়েকটি ওষুধ দিয়ে খাওয়ার নিয়ম লিখে দিয়ে বললেন ‘এগুলো খান। ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক না হলে তিন দিন পর আবার আসবেন।’ এরপর কথা হয় ওই মুরব্বির সঙ্গে। তিনি উপজেলার আফরা গ্রামের বাসিন্দা। নাম কাদের খান (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, অসুস্থ হলে না পারতে খুব একটা হাসপাতাল যান না। ফার্মেসিতে এসে শারীরিক সমস্যার কথা জানিয়ে ওষুধ কিনে খান। রোগ দীর্ঘদিন না থাকলে কখনোই ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয় না।
কেন ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয় না জানতে চাইলে তিনি অনেক বছরের অভিজ্ঞতার কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো : সরকারি হাসপাতাল বাড়ি থেকে অনেক দূরে। সেখানে গেলে ওই দিনটাই মাটি, সংসারের কোনো কাজ আর করা যায় না। হাসপাতালে গিয়ে বসে থাকতে অনেকটা সময় ব্যয় হয়। এরপর টেস্ট দিলে তা করাতে আবার লাইনে দাঁড়াতে হয়। সেখানে সব টেস্ট হয় না। বাইরে থেকেও করানো লাগে। কিছু ওষুধ ফ্রি দিলেও অনেক ওষুধ কিনতে হয়। যা ফ্রি দেয় তা ঠিক রকম কাজ করে কি না, সন্দেহ আছে। তা ছাড়া হাসপাতালে যাতায়াতেও টাকা লাগে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে আবার ডাক্তারের রুমের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ধাক্কাধাক্কি করে রুমে ঢোকা মাত্রই ডাক্তার দুই-চারটা কথা শুনে ব্যবস্থাপত্র লিখে ফেলে। তার চেয়ে ফার্মেসিই তাদের কাছে ভালো। এতে সময়ও বাঁচে, টাকাও বাঁচে। ফার্মেসিতে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট দাঁড়ালেই সহজে ওষুধ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে সরকারি ওষুধ, সরকারি ডাক্তারের প্রতি আস্থা সংকট এবং ব্যবস্থাপনার প্রতি মারাত্মক বিরক্তি রয়েছে।
কাদের খান জানান, ওই সাইনবোর্ড বাজারে বেসরকারি ক্লিনিক আছে। সেখানে ডাক্তার দেখাতেও আগে সিরিয়াল দেওয়া লাগে। বসে থাকতে হয়। আর ডাক্তারের ভিজিট ন্যূনতম ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। গ্রামে একটি কৃষাণের মজুরি ৮০০ টাকা। ৫০০ টাকাই যদি ডাক্তারকে দিতে হয়, তাহলে অনেকেরই অর্ধদিনের বেশি আয় চলে যায়। ক্লিনিকে শুধু ডাক্তারের ভিজিটের খচরই নয়; পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেয়। তাতেও এক দেড় হাজার টাকা লাগে। যারা একটু বেশি সচ্ছল তারা ছাড়া খুব অসুস্থ না হলে, অনেকেই সরকারি হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে যায় না।
কাদের খানের স্ত্রী মিতু বেগমের বয়স ষাটের কাছাকাছি। তিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন। একদিন ওষুধ না খেলে ভাত খেতে পারেন না। ঢাকায় কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়েছেন। কিন্তু তার ধারণা ঢাকার ডাক্তাররা তার রোগ ধরতে পারে না। তার আস্থা ফার্মেসি এবং স্থানীয় বাজারে চিকিৎসা দিতে বসা ব্যক্তিদের উপর। ঢাকায় প্রাইভেটে ভিজিট লাগে। টেস্টে টাকা লাগে। এগুলো তার কাছে অনেক বেশি মনে হয়। কিন্তু গ্রামের বাজারে বসা ব্যক্তিকে ৫০ টাকা ভিজিট দিলে হয়। ফার্মেসিতে গেলে তো ওই ৫০ টাকাও লাগে না। কেউ কেউ আছেন ২০ টাকাও ভিজিট নেন।
মিতু বেগম মনে করেন তার গ্যাসের সমস্যা। তিনি প্রতিদিন ১২০ মিলিগ্রামের গ্যাসের ওষুধ খান। গ্যাসের ওষুধ খেলে ভাত খেতে পারেন। বুক ছটফট কম করে। একবার ঢাকায় ডাক্তার দেখিয়ে ৫ মাসের মতো ভালো ছিলেন। তখন গ্যাসের ওষুধ খেতে হতো না। ডাক্তার তাকে দুটি ওষুধ সারা বছর খেয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু চার মাস পর তার মনে হয়েছে তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন এবং ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। এরপর আবার ওষুধ দুটি খাওয়া শুরু করেন এবং সুস্থ বোধ করলে আবার বন্ধ করেন। এই খাওয়া এই বন্ধ করা চলার একপর্যায়ে তার মনে হচ্ছে ওই ওষুধে আর কাজ হচ্ছে না। এখন তার ভরসা আবার সেই বাজারের চিকিৎসা দেওয়া ব্যক্তি আর ১২০ মিলিগ্রামের গ্যাসের ওষুধ।
শুধু গ্রাম নয়; ঢাকায়ও বহু মানুষ ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খায়। একটু গ্যাসের সমস্যা, মাথা ব্যথা এমনকি জ¦র হলে অনেকেই আগে যান ফার্মেসিতে। অবস্থা খারাপ হলেই তখন চিকিৎসকের কাছে যান। সামর্থ্যবানরা যান বেসরকারি হাসপাতালে, আর যাদের সামর্থ্য কম, তারা যান সরকারি হাসপাতালে। শুরুতে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে দেরিতে যাওয়ায় অনেকে মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়েন, অনেকের মৃত্যুও হয় ।
জুরাইন এলাকার সবুজ বলেন, আমার একবার ঠোঁটের উপরে কয়েকটা বিচি ওঠে। আমি বাসার নিচে ফার্মেসিতে গিয়ে বলে ওষুধ নিয়ে খেয়েছি। আমার মেয়ের বয়স তখন দুবছর। তারও কোনো সমস্যা হলে আগে ফার্মেসিতে যাই। তারা যদি বলেন, ডাক্তারের কাছে যেতে, তখন যাই। না হলে তাদের কাছ থেকেই ওষুধ নিয়ে খাওয়াই। বেশি সমস্যা না হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া হয় না।
ফার্মেসি থেকে যত্রতত্র ওষুধ দেওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) এখন এই শতাব্দীর অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এএমআরের কারণে ৩ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। শুধু বাংলাদেশেই ২০২১ সালে এএমআরের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯৬ হাজার ৮৭৮, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৪৫৪ মৃত্যু সরাসরি এএমআরের কারণে ঘটেছে। সেজন্য বারবার স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সতর্ক করা হচ্ছে।
২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল হাইকোর্ট সরকারকে নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এ বিষয়টি যুক্ত করা হয়। তবুও লোকজন চাইলে তাকে ফার্মেসি থেকে যেকোনো ওষুধ দিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ রোগী নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ওষুধের দোকানের বিক্রেতার পরামর্শ নেন বা নিজে নিজে ওষুধ সেবন করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে ওষুধের ডোজ ঠিকমতো না হওয়ায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে অনেকের মৃত্যু হয়, অনেকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েন, আবার দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
গত এক দশকে দেশে ফার্মেসিও বেড়েছে কয়েক গুন। কিন্তু সেই তুলনায় নেই নজরদারি বা মান নিয়ন্ত্রণ। রাজধানীর জুরাইনের কমিশনার রোডের রসুলবাগ মোড় থেকে চেয়ারম্যান বাড়ি পর্যন্ত এখন প্রায় ১৫টি ফার্মেসি আছে। অথচ ৫ বছর আগেও ছিল মাত্র দুই থেকে তিনটি। এই একই রকম চিত্র রাজধানীসহ সারা দেশে।
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ও সাবেক স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডক্টর আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে বোঝাতে হবে। সরকারি ডাক্তার ও ওষুধ নিয়ে যে আস্থার সংকট আছে তা দূর করতে মানুষকে বোঝাতে হবে। তারা যেন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজেরাই ওষুধ কিনে না খান।’
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে হবে। ফার্মেসিতে যতটা সহজে গিয়ে ওষুধ পায় এর বিকল্প সহজ ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে এই মানুষগুলো সরকারি সেবা নেবে না। শুধু সকালে ১০-২টা পর্যন্ত হলে হবে না। সন্ধ্যায়ও হাসপাতালে বহির্বিভাগ চালু রাখতে হবে। আমরা অনেক আগে সান্ধ্যকালীন সেবার জন্য একটা পাইলট প্রকল্প করেছিলাম। সেটি করতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। এখন অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্সের যে অবস্থা এভাবে চলতে থাকলে সামনে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। সেজন্য এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই বিষয়ে সরকারের নানা ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও আমরা শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু এখনো সেভাবে বাস্তবায়ন দেখছি না। আশা করছি সরকার দ্রুতই তাদের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন করবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে গুরুত্ব্ দিচ্ছে। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। সেজন্য সরকার প্রতিরোধে জোর দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে। যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করাসহ রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ করবেন।