কমলাফুলির দেখা

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ছাত্রদের নবীনবরণ ও ক্লাস শুরুর সভা শেষে বিভাগে ফিরছি। এমন সময় সার্জারি ও রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান আমার সামনে এসে মোটরসাইকেলের ব্রেক কষলেন। বললেন, ‘স্যার, অনুষদে যাবেন, আসুন নামিয়ে দিয়ে আসি।’ হাঁটতে ভালো লাগছে না, তাই বাইকে চড়ে বসলাম। তিন মিনিটের মধ্যেই ভেটেরিনারি অনুষদের কাছাকাছি চলে এলাম। বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগারের (ময়ূরশালা) পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আতাউরকে বললাম, ‘এখানেই নামিয়ে দাও, অনেকদিন ময়ূরগুলোকে দেখি না’। ময়ূরশালার দিকে যেতে বড়ই গাছের ডালে হঠাৎ কমলা রঙের একটি পাখি এসে বসল। সঙ্গে ক্যামেরা নেই। চুপি চুপি খানিকটা ওর কাছাকাছি এসে মোবাইলে দুটি ক্লিক করলাম। কিন্তু সেই ছবিতে মন ভরল না। আরেকটু সামনে এগোতেই পাখিটি ময়ূরশালার  পেছনে জঙ্গলে হারিয়ে গেল।

ময়ূরগুলোর খোঁজখবর নিয়ে জঙ্গলের দিকে পা বাড়ালাম। জঙ্গলের সামনে আমার নিজ হাতে লাগানো কাঁঠাল গাছের দিকে যেতেই মাটিতে পাখিটিকে খাবার খুঁজতে দেখলাম। মিনিটখানেক পরে আরেকটি একই পাখি এসে হাজির হলো। এ সময়টা ওদের ডিম-ছানা তোলার সময়। কাজেই খুঁজলে আশপাশেই বাসা পাওয়া যাবে। কিন্তু ক্যামেরা না থাকায় বিভাগে চলে এলাম। রুম থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে আবারও নিচে নামলাম। আশপাশটাতে খুঁজতেই মাটির ওপর খাবার খোঁজারত একটিকে পেয়ে গেলাম। পাখিটি বেশ ক’টি কেঁচো মুখে নিয়ে একটি গাছের ডালে বসল। দু-তিনটি ক্লিক করতেই সামনের দিকে উড়ে গেল। এরপর ময়ূরশালার পাশের চালতা গাছটির বড় পাতার নিচে ঢুকে গেল। একটু সামনে এগিয়ে ভালোভাবে খুঁজতেই বাসাটির সন্ধান পেলাম। বাসায় আরেকটি পাখি বসে আছে। সম্ভবত ডিমে তা দিচ্ছে। কেঁচোমুখে যে পাখিটি উড়ে এলো সে আসলে ডিমে তা দানরত পাখিটিকে খাওয়াতে এসেছে। মুখে কেঁচো দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম বাসায় বোধহয় ছানা আছে। কিন্তু বাসা ও পাখিদের বেশকিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলাম ছানা নয় বরং সঙ্গীকে খাওয়ানোর জন্যই কেঁচো এনেছে। পাখি দুটির সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে রুমে চলে এলাম। ২০১৬ সালের ৫ জুলাই বিকেলের ঘটনা এটি।

এতক্ষণ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা কমলা রঙের যে পাখিটির গল্প বললাম সে এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি কমলাফুলি। গ্রাম-বাংলায় এ নামটি বেশি প্রচলিত, আমারও বেশ পছন্দ। এ ছাড়া কমলা দামা, কমলা দোয়েল, মেটে দোয়েল বা কমলাবউ নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ঙৎধহমব-যবধফবফ ঞযৎঁংয। টুরডিনি (ঞঁৎফরহধব) গোত্রের এই শাখাচারী পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম এবড়শরপযষধ পরঃৎরহধ (গেকিচলা সিট্রিনা)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটিকে দেখা যায়।

কমলাফুলি দোয়েল আকারের পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ২১-২২ সেন্টিমিটার। ওজন ৬০ গ্রাম। পুরুষ পাখির মাথার চাঁদি ও ঘাড়-বুকের পালকের রঙ গাঢ় কমলা। তার ওপর রয়েছে হালকা হলুদের ছোঁয়া ও লালচে আভা। পেট ও লেজের নিচের পালক সাদা। পিঠ ও লেজের উপরটা নীলচে-ধূসর। ডানার প্রান্তে কয়েকটি সাদা দাগ দেখা যায়। স্ত্রীটি দেখতে পুরুষটির মতোই, তবে বুকের রঙ কিছুটা এবং পিঠ ও লেজ ছাই রঙা। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ঠোঁট কালচে; পা ও আঙুল হালকা গোলাপি। মায়াবী চোখের মণি পিঙ্গল। ছানাগুলোর পালকের রঙ গাঢ় ধূসর, তার ওপর কমলা রঙের ছোপ ছোপ।

এরা বেশ লাজুক পাখি। মানুষের চোখের আড়ালে গ্রামীণ ঝোপ-জঙ্গল, বন-বাগান বা বাঁশঝাড়ের স্যাঁতসেঁতে নির্জন পরিবেশে বিচরণ করে। প্রজননের সময় ছাড়া সাধারণত একাকী জোড়পায়ে ছোট ছোট লাফ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মাটিতে পড়ে থাকা পাতা উল্টে পোকা-মাকড়, কেঁচো ইত্যাদি খায়। ফলও খেতে পারে। ‘চিরি-চিরি-রিরি---ঝিরি বা কিরি-কিরি---কিরি-কিরি’ স্বরে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় ১-৫ মিটার উঁচু কোনো গাছের ঘন পাতাওয়ালা দুই ডালের ফাঁকে শুকনো পাতা, মস, ঘাস, সরু শিকড় ও মাটি দিয়ে চায়ের পেয়ালার মতো বেশ মজবুত বাসা বানায়। স্ত্রী কমলাফুলি ৩-৪টি গোলাপি রঙের ডিম পাড়ে; তার ওপর থাকে নীলচে ও ফিকে আভা, আর সামান্য ছিট-ছোপ। ডিম ফোটে ১৪ দিনে। ছানারা উড়তে শিখে ১৩ দিনে। আয়ুষ্কাল ৪-৮ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ