দখল-দূষণ, পলি জমা ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদ কপোতাক্ষ তার নাব্য হারিয়ে অনেক স্থানে মরা খালে পরিণত হয়েছে। ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনার বিভিন্ন অংশ দিয়ে প্রবাহিত নদীটির তলদেশ দ্রুত ভরাট হয়ে পড়ছে। ভরা বর্ষাতেও নদীটির অনেক অংশে পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে সরু নালার চেহারা ধারণ করেছে। নদী পুনরুদ্ধারে দুই দফায় কয়েক শ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও কাক্সিক্ষত সুফল মেলেনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুষ্টিয়ার মাথাভাঙ্গা নদীর শাখা হিসেবে ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনার কয়রা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া এই দীর্ঘতম নদ এখন উপকূলবাসীর গলার কাঁটা। এই নদ একদিকে নাব্য হারিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে, অন্যদিনে ভাঙনের গ্রাসে শত শত পরিবারকে গৃহহীন করছে। খুলনার কপিলমুনি, চাঁদখালী, কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, যশোরের কেশবপুর, তালা এলাকার নদীকেন্দ্রিক বসতি এলাকায় কপোতাক্ষসহ প্রধান নদ-নদীগুলো রক্ষায় পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ফলে স্থানীয় জেলে ও কৃষকদের জন্য নদ-নদী অনেক ক্ষত্রে কুফল বয়ে এনেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কপোতাক্ষ নদ পুনরুদ্ধারে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি। প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালে শুরু হওয়া ‘কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ শেষ হয় ২০১৭ সালে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। পরে ২০২০ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প শুরু হয়, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩১ কোটি টাকা। দুই দফায় মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮১৭ কোটি টাকা। বর্তমানে যশোরের তাহেরপুর থেকে মনিরামপুর এবং খুলনার পাইকগাছা থেকে কয়রার আমাদী পর্যন্ত নদী খনন, তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। প্রকল্পটি চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, খনন শুরু হওয়ার কয়েক দিন না যেতেই আবার পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বারবার প্রকল্প হচ্ছে, টাকা খরচ হচ্ছে; কিন্তু সুফল মিলছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কপোতাক্ষের দৈর্ঘ্য ৩৬৭ কিলোমিটার। ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনাÑ এই চার জেলার ভেতর দিয়ে কয়রা উপজেলা হয়ে সুন্দরবনের মধ্যে আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের মালঞ্চ মোহনায় পড়েছে। তবে বাস্তবে সেই অংশে এখন নদের চেয়ে ডুবোচর বেশি। কোথাও কোথাও নদের প্রস্থ কমে ৭৫০ মিটার থেকে মাত্র ১৫০ মিটারে ঠেকেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাইকগাছা থেকে আমাদী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় দুই পাশজুড়ে বিশাল চর আর দখলের চিহ্ন নিয়ে কোনোমতে অস্তিত টিকিয়ে রেখেছে কপোতাক্ষ। এই এলাকায় খননের চিহ্ন থাকলেও স্বাভাবিক রূপ নেই, বরং সরু খালের মতো দেখায়। নদের তলদেশ পলিতে ভরাট হয়ে বড় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দুই পাড়ে জেগে ওঠা জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বসতঘর, ইটভাটা ও চিংড়িঘের।
কয়রার গোবরা গ্রামের বাসিন্দা মোজাম গাজী বলেন, খননের এক বছরের মধ্যেই নদ আবার ভরাট হয়ে গেছে। আগে ভরা জোয়ারেও পানি বাঁধ ছুতো না। এখন নদের নিচে পলি জমে বাঁধ উপচে পানি পড়ে। প্রতি বছর লোনা পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হচ্ছে। এতে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। পাইকগাছার কপোতাক্ষ পাড়ের দেয়াড়া, রহিমপুর, সলুয়া, হাবিবনগর, রামচন্দ্রনগর, বোয়ালিয়ার মালোপাড়া, হিতামপুর এবং বাঁকা মালোপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, সেসব এলাকায় নদীভাঙন রয়েছে। বোয়ালিয়ার মালোপাড়ার বাসিন্দা সুশান্ত বিশ্বাস বলেন, ‘অব্যাহত নদীভাঙনে প্রাচীন জেলেপল্লীগুলো এখন সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে।’
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন-সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বলেন, ‘একসময় কৃষকরা অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে লোনা পানি ঠেকিয়ে কৃষিকাজ করত। এতে নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বজায় থাকত। কিন্তু ষাটের দশকে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পর জোয়ারের পানি বিলে ঢুকতে না পারায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে ক্রমে উঁচু হওয়ায় নদীগুলো নাব্য হারাচ্ছে।’ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘নদী একটি জীবন্ত সত্তা, নদীর জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের। উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় খুলনা অঞ্চলের কপোতাক্ষ, শিবসা, শোলমারীসহ মৃতপ্রায় নদ-নদী, খালগুলো পরিকল্পিতভাবে খনন করা দরকার। সেগুলো অবৈধ দখলমুক্ত করে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
কপোতাক্ষের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের উপসহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘খুলনার পাইকগাছা থেকে কয়রা পর্যন্ত সাতটি প্যাকেজে খনন সম্পন্ন হলেও প্রায় ৭৫ লাখ ঘনমিটার পলি এসে নদীর ৭০ থেকে ৭৮ শতাংশ আবার ভরাট হয়ে গেছে। শুধু খনন করে এ অঞ্চলের নদ-নদী সচল রাখা সম্ভব নয়। যেখানে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) কার্যকর হয়েছে, সেখানে নদী সচল আছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যয়বহুল এবং বড় আকারে জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন।’ পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদীন বলেন, ‘উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও পলি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাই কপোতাক্ষের নাব্য সংকটের মূল কারণ। মূলত
পদ্মা-গড়াই হয়ে উজানের প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।