চট্টগ্রামের আনোয়ারায় পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার কমে যাচ্ছে। এক সময় ব্যাপক প্রচার থাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছিল। এখন সেভাবে চোখে পড়ে না কার্যক্রম। দিন দিন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর সংখ্যাও কমছে।
পরিবার পরিকল্পনার হার নিয়ে গর্ব করার মতো ঈর্ষণীয় জাতীয় সাফল্য এখন মøান হওয়ার পথে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অবহেলা, অমনোযোগ ও গাছাড়াভাবের কারণে পুরো জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তথা পরিবার পরিকল্পনায় লালবাতির দশা। জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, কনডমসহ বিভিন্ন উপকরণের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার পথে, যার প্রভাব পড়েছে এ উপজেলায়ও।
সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে এক জরিপে দেখা যায়, আনোয়ারা উপজেলায় পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির ব্যবহার প্রায় ৩৫ শতাংশ। এটি প্রায় ৫ বছর আগের তুলনায় ২০ শতাংশ কম। কম শিক্ষিত এবং গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে তেমন অবগত নয়। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর অভাব এবং উপকরণের ঘাটতিও রয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করছেন, ৫ বছর আগে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণকারীর হার ছিল ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
উপজেলার চাঁপাতলী, হাজীগাঁও ও মোহাম্মদপুর এই তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক গত মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেগুলো তালাবদ্ধ ছিল। অথচ সরকারি নিয়মে ওই দিন এসব ক্লিনিকে পরিবার কল্যাণ সহকারীদের সেবা দেওয়ার কথা। জানা গেছে, উপজেলার অন্য কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর অবস্থাও একই।
চাঁপাতলী কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিবার কল্যাণ সহকারী কাজী রিনা আক্তার কেন্দ্রে অনুপস্থিতির কথা স্বীকার করে বলেন, সুপারভাইজারকে জানিয়ে তিনি ওই দিন যাননি। তবে নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেন। এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক সাগর দাশ বলেন, ‘জনবলের কিছু ঘাটতি থাকলেও কাজের গতিতে কোনো ঘাটতি নেই। আমরা মনোযোগ দিয়ে সরকারের উদ্যোগ সফলের আপ্রাণ চেষ্টা করছি।’
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রে জানায়, কয়েক বছর ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকরণ সামগ্রীর সরবরাহ অনেকটা কমে গেছে। এখন এসব উপকরণের মজুদ খুব সীমিত। জন্মনিরোধক খাওয়ার বড়ি, কনডম ও ইনজেকশনের তিন মাসের মজুদ আছে। ইন্ট্রা ইউটারিন ডিভাইস-আইইউডি মজুদ আছে এক মাসের। তবে সারা দেশের মতো এ উপজেলাতেও জনপ্রিয় পদ্ধতি দুই কাঠির ইমপ্ল্যান্ট সরবরাহ নেই। এই সুযোগে বাজারে বেসরকারি কোম্পানির বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতে নিম্নবিত্ত দম্পতিদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যের হার আনোয়ারা উপজেলায়। জেলার ১৫টি উপজেলা ও ১৫টি থানার মধ্যে এ উপজেলায় দারিদ্র্যের হার ৩৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ আনোয়ারা উপজেলার প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৩৪ জনের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে বা ‘গরিব’। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দারিদ্র্য পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে বিবিএসের মানচিত্রে। এতে বলা যায়, ২০১০ সালের তুলনায় আনোয়ারা উপজেলায় দারিদ্র্যের হার বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। বিবিএস প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালে গ্রামে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার ছিল ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ছিল ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২১ সালে ছিল ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের সূত্র জানায়, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং উপকরণ বিতরণের জন্য উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে একজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক ও তিনজন পরিবারকল্যাণ সহকারী দায়িত্ব পালন করেন। এই কর্মীদের সপ্তাহে দুই দিন কমিউনিটি ক্লিনিকে ও চার দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে দম্পতিদের সঙ্গে আলোচনা ও সামগ্রী বিতরণ করার কথা। তবে জনবল ও উপকরণ ঘাটতির কারণে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের অনেকেই নিয়মিত বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন না। আবার যারা যাচ্ছেন তারাও দম্পতিদের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বাজার থেকে উপকরণ সংগ্রহের পরামর্শ দিচ্ছেন।
পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদাসীনতা, কেনাকাটায় স্বেচ্ছাচারিতা এবং পরিকল্পনার অভাবে উপকরণের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত ১৫ বছরে এতটা সংকট দেখা যায়নি। বলতে গেলে পরিবার পরিকল্পনায় সরকারি সেবা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
আনোয়ারা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দেবরাজ চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘এ উপজেলায় পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের ১১৪টি পদের মধ্যে ৪৮টি পদ শূন্য রয়েছে। জনবল সংকটের পাশাপাশি অনেক কেন্দ্রের (সিসি) জরাজীর্ণ অবস্থা। এরপরও মাঠপর্যায়ে ও কেন্দ্রগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা সেবার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’