উচ্ছ্বাস, আবেগ, আনন্দ ও বেদনার মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালিরা ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসবে ৮ দল নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে এসে পৌঁছেছি। কোয়ার্টার ফাইনালের পর চার দল নিয়ে সেমিফাইনাল। এরপর ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনাল। চলমান বিশ্বকাপ কে জিতবে, এই প্রশ্ন এখন সবার। তবে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবেন না। এখানেই ফুটবলের রহস্য এবং রসিকতা। শিরোপা কোন ঘরানায় যাচ্ছে ইউরোপ না লাতিনে? বর্তমানে লাতিনের ঘরে আছে ফিফা বিশ্বকাপ। লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, কাতার বিশ্বকাপ (২০২২) থেকে এটি জয় করে নিয়ে গেছে। এই কাপ ২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত দখলে ছিল ইতালি, স্পেন, জার্মানি এবং ফ্রান্সের। বিগত ২২টি বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে শিরোপা জয়ে লাতিন দেশগুলোর চেয়ে থেকে ইউরোপিয়ানরা এগিয়ে আছে। ফাইনালে যে দেশই জিতুক না কেন, রূঢ় বাস্তবতা হলো এতে আমাদের সত্যি কি কিছু যায় আসে? শিরোপা যে জিতবে, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তো শুধু ফুটবল-কেন্দ্রিক। মাঠে ফুটবল শেষ, আমাদেরও সব উচ্ছ্বাস এবং আবেগের বাতি নিভে যাবে। আবার অপেক্ষা চার বছর। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের শত বছরের উৎসব উদযাপন।
দেশে ফুটবল ঘিরে ঘোর অমাবস্যা। স্বাধীন দেশে গত ৫৫ বছরে দেশের ফুটবলের কোমর সোজা করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতগুলো বছরেও, বাংলাদেশ ফুটব০ল ফেডারেশন একটি নিজস্ব ফুটবল মাঠের মালিক হতে পারেনি। আধুনিক স্টেডিয়াম তো অনেক দূরের। অথচ বাঙালির ফুটবলের একটি শেকড় আছে। আছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। একটি সময় উপমহাদেশের (অখণ্ড ভারতবর্ষ বলতে বুঝাত বাঙালির ফুটবল) ফুটবলে বাঙালিরা ছিল সেরা। যে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আমাদের এত উচ্ছ্বাস, এদের মধ্যে অধিকাংশ দেশের পরিচয়ই হয়নি ফুটবলের সঙ্গে, যখন আমাদের পূর্বপুরুষরা দাপটের সঙ্গে ফুটবল খেলেছেন। আমাদের ঢাকার মাঠেও ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাব কোরিন্থিয়ান এফসি ক্লাবকে বাঙালি দল পরাজিত করেছে এখন থেকে ৮৯ বছর আগে। এরও অনেক আগে ১৯৯১ সালে কলকাতা মোহনবাগান ক্লাব (এই দলের ৮ জন খেলোয়াড় ছিলেন পূর্ব বাংলার সন্তান) আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ইস্ট ইয়র্ক দলকে পরাজিত করে প্রথম স্থানীয় দল হিসেবে শিল্ড জিতেছে। বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ইংলিশ লিগ শুরু হয়, ১৮৮৮ সালে। এর আগে ১৮৭১ সালে দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চ্যালেঞ্জ কাপ যেটি এখন এফএ কাপ নামে পরিচিত। কিন্তু ১৮৮৮ সালে ভারতের সিমলায় স্যার মার্টিসার ভুরান্ডের নামে ভুরান্ড কাপের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ১৮৮৯ সালে কলকাতায় শুরু হয়েছে ট্রেডস কাপ টুর্নামেন্ট। এরপর ১৮৯১ সালে শুরু হয় মুম্বাইয়ে রেভার্স কাপের বিভাগ লিগের শুরু ১৮৯৮ সালে। এ লিগে ১৯৩৪ সালে কলকাতার প্রথম বিভাগ কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং প্রথমবারের মতো খেলতে নেমে (১৯৩৪) বিদেশি খেলোয়াড় নিয়ে গঠিত দলগুলোর একনাগাড়ে পাঁচ ফুটবল মৌসুম চ্যাম্পিয়ন হয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে। এই মোহামেডান দলে বিভিন্ন মৌসুমে আমাদের এই বাংলার অনেক বাঙালি খেলোয়াড় খেলেছেন।
ঢাকায় ফুটবল লিগের খেলা শুরু, ১৯১৫ সাল থেকে। ১৯২০ সাল থেকে ঢাকায় শুরু হয়েছে স্যার বোলান্ডস চ্যালেঞ্জ শিল্ডের খেলা। ১৮৯৮ থেকে ইতালিতে শুরু হয় ‘ফেডারেল চ্যাম্পিয়নশিপ’। প্রথম সাতবারের মধ্যে ছয়বার শিরোপা জিতেছে ‘জেনোয়া।’ ১৯০৪ সালে জন্ম ফিফার। ফুটবল ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যেমন তখনো কিন্তু এগিয়ে এসেছিল ফ্রান্স। ব্রিটিশরা যান সেখানে। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু বিশ্বকাপ। ব্রিটেন আবার অংশ নেয়নি। বিশ্বকাপের আলোচনা শুরু অবশ্য ১৯২০ সালে। অ্যান্টওয়ার্পে ফিফা কংগ্রেসে নীতিগতভাবে এর প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়েছিল, ২৪ অলিম্পিকে দাবি জোরদার করার পর ১৯২৬ কংগ্রেসে ফ্রান্স ফুটবল সংস্থার সচিব হেনরি ডিলনে শেষ পর্যন্ত ঘোষণা করেন অলিম্পিকের ঘেরাটোপে ফুটবলকে এখন বন্দি করে রাখা অনুচিত। বহু দেশে পেশাদারি পক্ষ চলছে। কাজেই সেই সমস্ত দেশ বঞ্চিত হচ্ছে তাদের সেরা ফুটবলারদের অলিম্পিক খেলাতে না পেরে। ১৯২৮ সালে আমস্টারডামে ভিলনের কথা মেনে নিয়ে ২য় সিদ্ধান্ত হয় বিশ্বকাপ হবে। আশ্চর্যের কথা, প্রথম বিশ্বকাপের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল সেই কংগ্রেসে অংশগ্রহণকারী তিরিশটি দেশের পাঁচটি। নরওয়ে, সুইডেন এমনকি ডেনমার্ক ছিল সেই তালিকায়। মজার ব্যাপার, যখন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় তখন উরুগুয়ে, ইতালি, হল্যান্ড এবং স্পেনের সঙ্গে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার আবেদন জানিয়েছিল সুইডেনও। আমাদের ফুটবল ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধিশালী। কিন্তু ঐতিহ্যকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি ফুটবলকে দাঁড় করানোর জন্য।
আমাদের কাছে ফুটবল আবেগ ও উচ্ছ্বাসের মধ্যে বন্দি থেকেছে। বুঝিনি ফুটবলকে দাঁড় করানোর গুরুত্ব। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, আমাদের পরে ফুটবল শুরু করে অনেক দেশ এখন বিশ্ব ফুটবল মানচিত্রে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। এদিকে আমরা সব সময় বিভিন্ন ধরনের সমস্যার বয়ান শুনিয়ে সময় পার করে চলেছি। এভাবে চললে আগামী ৪০ বছরেও আমরা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে যেতে পারব না। সঠিক পরিকল্পনা এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। সম্ভব নয় ইতিবাচক মানসিকতা এবং আত্মবিশ্বাস ছাড়া। ৯৬ বছরে বিশ্বকাপের ইতিহাসে যে ৮৪টি দেশ চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলেছে বিভিন্ন সময়, তারা কারা? তাদের সবার অর্থনৈতিক সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা এক নয়। দুর্বল অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও অনেক দেশ পেরেছে স্বপ্ন পূরণ করতে। কারণ তারা স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য, সবাই ঐকমত্য পোষণ করে প্রয়োজনীয় কাজগুলো ধর্ম পালনের মতো করেছে। এই জায়গায় আমাদের রয়েছে ঘাটতি, যা দূর করতে না পারলে অনেক স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।
লেখক : ক্রীড়া বিশ্লেষক সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া।