তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট

এবার দায়িত্ব সংসদের

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৭:১০ এএম

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ ৯ জুলাই আপিল নিষ্পত্তি করে সংক্ষিপ্ত এ রায় ঘোষণা করেন। আমরা জানি, ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সংসদে পাস হয়। এরপর দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের প্রায় সব কটি নির্বাচনেই অস্বচ্ছতার কমবেশি ছাপ লাগে এবং সৃষ্টি হয় নানা রাজনৈতিক বিতর্ক। একই সঙ্গে বহুবিধ রাজনৈতিক অনাসৃষ্টি অনেক অর্জনের বিসর্জনও ঘটায়। এজন্য দেশ-জাতিকে অনেক মর্মন্তুদ ঘটনারও সাক্ষী হতে হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর তৈরি হয় নতুন প্রেক্ষাপট। ওই প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন করে আনা সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক।

১০ জুলাই দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে এই রিটের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক এ ব্যাপারে দেশ রূপান্তরে তার অভিমত ব্যক্ত করে লেখেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের ধারাটা সুপ্রিম কোর্ট বেআইনি বলেছেন। তার মানে এখন প্রশ্ন হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে হবে? আগে ছিল, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান এবং ১০ জন থাকবেন উপদেষ্টা। এখন কে হবেন, কীভাবে হবেন তার রূপরেখা কীভাবে হবে, সেটা ঠিক করার জন্য সংসদকে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে এবং আইন পাস করে বলতে হবে।’ অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে ফ্যাসিবাদের নীলনকশা তৈরি করা হয়েছিল। আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম এটি ‘আল্ট্রা ভাইরাস’ (আইনগত সীমার বাইরের বিষয়)। হাইকোর্ট বিভাগ এই সংশোধনীর কিছু বিষয় অবৈধ ঘোষণা এবং বাকি বিষয়গুলো জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছে। সুতরাং হাইকোর্টের রায়ই এখন চূড়ান্ত।’

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও টানাপড়েন আদালতের রায়ে মীমাংসা হলেও এ বিষয়টি সাংবিধানিক ও আইনানুগ করতে এখন গুরুভার বর্তেছে জাতীয় সংসদের ওপর। আমরা জানি, যেকোনো আইন সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিবেচনা করে অসাংবিধানিক বা বেআইনি ঘোষণা করতে পারেন এবং তখন সংগত কারণেই অবৈধ কিংবা বেআইনি ঘোষিত আইনের কার্যকারিতা আর থাকে না। সুপ্রিম কোর্টের রায় নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের জন্য অবশ্য পালনীয়, এটাই সংবিধানের বিধান। সুপ্রিম কোর্ট আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের বিচার কার্যক্রম চালানোর এখতিয়ার নেই। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার রূপরেখা কী হবে কিংবা এর মেয়াদইবা হবে কত দিনের, ওই সরকারের প্রধান ও তার সহযোগী কারা হবেন এসব বিষয় আইনে রূপ দিতে সংবিধানে আরেকটি সংশোধনী আনা সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। আমরা আশা করব, জাতীয় সংসদে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এর আইনানুগ ভিত্তি চূড়ান্ত হবে।  

আমাদের অজানা নয়, অবাধ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জোরালো হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতার পারদ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারে এক মত, গঠন প্রক্রিয়ায় ভিন্ন মত স্পষ্টই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আমরা মনে করি, এ ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণ নিয়ে যে চ্যালেঞ্জ ছিল এর অবসান হলো। মনে রাখা বাঞ্ছনীয় পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় দেশে-বিদেশে এই ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। গণতন্ত্র হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। গণতন্ত্র-সুশাসন-জনঅধিকার নিশ্চিতকরণে স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। জনগণের অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন অপরিহার্য।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত