সংযম, ভারসাম্য ও সরলতার মাধ্যমে সুন্দর জীবন গড়ে তোলার আহ্বান জানায় ইসলাম। ইসলামে সরল জীবনযাপন বলতে দারিদ্র্যকে বরণ করে নেওয়া বা নিজের ওপর অপ্রয়োজনীয় কষ্ট চাপিয়ে দেওয়াকে বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলো প্রয়োজন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, অপচয় থেকে বিরত থাকা, অহংকার ও প্রদর্শনীর মানসিকতা পরিহার করা এবং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহার করা। একজন মুসলমানের প্রকৃত সৌন্দর্য তার চরিত্রে, তাকওয়ায় ও উত্তম আমলে। বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা খাও, পান করো। কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ ৩১)
এই আয়াত ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির একটি মৌলিক ভিত্তি। ইসলাম মানুষের বৈধ চাহিদা পূরণের অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু সীমা লঙ্ঘনের অনুমতি দেয়নি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়, অহেতুক বিলাসিতা কিংবা অন্যকে দেখানোর জন্য অর্থ খরচ করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না। বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পথ অবলম্বন করে।’ (সুরা ফুরকান ৬৭)
এ আয়াতে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে। ইসলাম মানুষকে কৃপণ হতে শেখায় না। আবার বেহিসাবি ব্যয়ও সমর্থন করে না। মধ্যপন্থাই ইসলামের সৌন্দর্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল সরলতার উজ্জ্বলতম উদাহরণ। তিনি চাইলে রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। বহু দিন তার ঘরে চুলা জ্বলত না। খেজুর ও পানি দিয়েই অনেক সময় দিন কাটত। তার ঘরের আসবাব ছিল খুবই সাধারণ। একবার হজরত ওমর (রা.) নবীজি (সা.)-এর ঘরে গিয়ে দেখলেন, খেজুর পাতার তৈরি একটি চাটাইয়ের ওপর তিনি শুয়ে আছেন। সেই চাটাইয়ের দাগ তার শরীরে পড়ে গেছে। দৃশ্যটি দেখে ওমর (রা.) কেঁদে ফেলেন। তখন নবীজি (সা.) বলেন, ‘তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখেরাত?’ (সহিহ বুখারি)
তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো বৈধ নেয়ামত গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করেননি। তিনি পরিচ্ছন্ন পোশাক পরতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সৌন্দর্যবোধকে উৎসাহ দিতেন। কিন্তু কখনো অপচয়, অহংকার বা বিলাসিতাকে প্রশ্রয় দেননি। এতে বোঝা যায়, ইসলাম সৌন্দর্যের বিরোধী নয়, বরং প্রদর্শনীর বিরোধী।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও সরলতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন। হজরত ওমর (রা.) ছিলেন বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক। বিদেশি দূতরা তাকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাটিতে বসে থাকতে দেখে বিস্মিত হতেন। ইসলামের ইতিহাস প্রমাণ করে, নেতৃত্বের মর্যাদা বিলাসিতায় নয়, বরং ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ ও বিনয়ে।
বর্তমান যুগে ভোগবাদ মানুষের জীবনকে জটিল করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখে অনেকেই নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। প্রয়োজনের চেয়ে বিলাসিতার প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, ঋণ নিয়ে বিলাসী জীবন, অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা এবং অহেতুক খরচ সমাজে নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। অথচ ইসলাম মানুষকে শেখায়, প্রকৃত মর্যাদা আল্লাহর কাছে। মানুষের প্রশংসা অর্জনের জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনা করাই একজন মুমিনের লক্ষ্য।