সুখী সমাজ বিনির্মাণে ৮ দিকনির্দেশনা

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৩ এএম

মানুষ সর্বদা সুখ খোঁজে। শান্তি পাওয়ার জন্য চারদিকে ছুটে চলে। কিন্তু আসল শান্তি কোথায়? এর উত্তর আছে কোরআনে। পবিত্র এই গ্রন্থ আমাদের আলোর পথ দেখায়। জীবনের মূল উদ্দেশ্য মনে করিয়ে দেয়। সুরা শুরায় এর চমৎকার বিবরণ রয়েছে। যা মানুষের জীবনকে সুন্দর করে। সমাজকে শান্তিময় করে।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের যা কিছু দেওয়া হয়েছে তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ মাত্র। আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী, তাদের জন্য যারা ইমান আনে এবং তাদের রবের ওপরই ভরসা করে। আর যারা বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে এবং রাগান্বিত হলেও ক্ষমা করে দেয়। আর যারা তাদের রবের ডাকে সাড়া দেয়, নামাজ আদায় করে, তাদের কার্যাবলি তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয় এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। যখন তাদের ওপর জুলুম হয়, তখন তারা তার প্রতিবিধান করে। মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। এরপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। নিশ্চয়ই তিনি জালেমদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা শুরা ৩৬-৪০)

এই আয়াতগুলোতে আদর্শ মানব চরিত্র গঠন এবং একটি বৈষম্যহীন, সুখী সমাজ বিনির্মাণের জন্য আটটি বিষয়ের দিকনির্দেশনা পাই। এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

আল্লাহর প্রতি অবিচল ইমান : আয়াতে প্রথম ও প্রধান শর্ত হিসেবে ইমানের কথা বলা হয়েছে। ইমান হলো ইসলামের মূল ভিত্তি এবং আধ্যাত্মিক জীবনের প্রাণ। একজন মুমিন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় এবং সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। পার্থিব জগতের ক্ষণস্থায়ী জাঁকজমক ও বস্তুগত সম্পদ মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রলুব্ধ করে। কিন্তু একজন খাঁটি ইমানদার ব্যক্তির কাছে দুনিয়ার এই ভোগসামগ্রী খুবই তুচ্ছ। আল্লাহর কাছে পরকালে যে প্রতিদান রয়েছে, তাই একমাত্র স্থায়ী ও সর্বোত্তম। এই বিশ্বাস মানুষকে জীবনের সব প্রতিকূলতার মধ্যেও সৎপথে চলার শক্তি জোগায়।

আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা : মুমিনের দ্বিতীয় প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর ওপর ভরসা করা। সুসময় কিংবা দুঃসময়, সব অবস্থাতেই আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা তাওয়াক্কুলের অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে এবং কোনো চেষ্টা করবে না। বরং মানুষ তার সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এই মানসিকতা মানুষকে চরম বিপদেও হতাশা থেকে মুক্ত রাখে। যখন কোনো ব্যক্তি বিশ্বাস করে, তার রবের ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটে না, তখন তার মনে এক ঐশ্বরিক প্রশান্তি বিরাজ করে।

কবিরা গুনাহ বর্জন : সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য ব্যক্তির চরিত্র গঠন অপরিহার্য। আয়াতে বড় বড় পাপ এবং প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের অশ্লীল কাজ থেকে দূরে থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কবিরা গুনাহ মানুষের অন্তরকে অন্ধকার করে দেয় এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। অন্যদিকে, অশ্লীলতা সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় এবং সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। বর্তমান যুগে যেখানে পঙ্কিলতার বিস্তার সহজ, সেখানে মুমিন ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর ভয়ে নিজেকে এসব থেকে মুক্ত রাখেন।

রাগ দমন ও ক্ষমাশীলতা : মানুষ হিসেবে রাগ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু সেই রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং রাগান্বিত অবস্থায় অপরকে ক্ষমা করে দেওয়া এক অনন্য উচ্চমার্গীয় গুণ। ইসলামে ক্রোধ দমনকে অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে, মুমিনরা রাগান্বিত হলেও প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমার পথ বেছে নেয়। এই গুণটি পারস্পরিক সম্পর্ককে মজবুত করে এবং সমাজে হিংসা-বিদ্বেষের আগুন ছড়াতে বাধা দেয়।

আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া : আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার অর্থ হলো তার সমস্ত আদেশ ও নিষেধ বিনাবাক্যে মেনে নেওয়া এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে তার বিধানের অনুগত হওয়া। এই সাড়াদানের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান মাধ্যম হলো নামাজ আদায় করা। নামাজ হলো মুমিনের জীবনের মেরুদণ্ড এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সংযোগ সেতু। নামাজ মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে অন্যায়, পাপাচার ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে। নিয়মিত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মানুষের পুরো জীবন সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।

পারস্পরিক পরামর্শ : একটি পরিবার, সমাজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। আয়াতে মুমিনদের অন্যতম সামাজিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা তাদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সম্পন্ন করে। একে ইসলামি পরিভাষায় শুরা বলা হয়।

আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় : মানুষের উপার্জিত ধন-সম্পদ আসলে তার নিজের নয়, বরং তা আল্লাহর দেওয়া রিজিক। মুমিনরা বিশ্বাস করেন, তাদের সম্পদে সমাজের অভাবী, এতিম ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রয়েছে। তাই তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং মানবকল্যাণে তাদের রিজিক থেকে মুক্তহস্তে ব্যয় করেন। এটি হতে পারে ফরজ জাকাত, ওয়াজিব সদকা কিংবা সাধারণ দান-অনুদান।

অন্যায়ের প্রতিবিধান ও আপস নিষ্পত্তি : শেষের আয়াত দুটিতে একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ও আইনি নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মুমিনরা কাপুরুষ নয় এবং তারা অন্যায়কে মুখ বুজে সহ্য করে না। তাদের ওপর যখন কোনো জুলুম বা সামাজিক অন্যায় করা হয়, তখন তারা তার আইনি ও ন্যায়সংগত প্রতিবিধান করে। তবে ইসলামে প্রতিশোধের ক্ষেত্রেও সমতার নীতি বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যায়ের বদলা যেন অন্যায়ের চেয়ে বড় না হয়ে যায়। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, প্রতিবিধানের শক্তি থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ ক্ষমা করে দেয় এবং আপসের মাধ্যমে শান্তি ফিরিয়ে আনে, তবে আল্লাহর কাছে তার জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত