ডায়াবেটিস রোগীর হাঁটার নিয়ম

ডায়াবেটিস চিকিৎসায় অন্যতম প্রধান বিষয় হলো যাপিত জীবনে পরিবর্তন সাধন। এই পরিবর্তন আনতে হয় খাদ্যাভ্যাসে, দৈনন্দিন কর্মকা-ে। শরীরচর্চা বা ব্যায়াম ডায়াবেটিস রোগীদের যাপিত জীবনের অন্যতম প্রধান অভ্যাসে পরিণত করা সুস্থতার জন্য জরুরি।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হাঁটার সুফল

নিয়মিত শরীরচর্চা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডায়াবেটিসের মূল সমস্যা হলো ইনসুলিনের অভাব অথবা অকার্যকারিতা। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন থাকে অকার্যকর বা ভোঁতা। হাঁটার ফলে ইনসুলিন শানিত হয়। পেশি কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ করার জন্য প্রয়োজন পড়ে শানিত ইনসুলিন। হাঁটার ফলে পেশি কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ সহজ হয়। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের দিকে নেমে আসে। হাঁটার ফলে ওজন নিয়ন্ত্রিত থাকে, যা প্রকারান্তরে রক্তের চিনির মাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। হাঁটার ফলে রক্তের চর্বির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়, ফলে ডায়াবেটিসের জটিলতা হ্রাস পায়। হাঁটার ফলে ঘুম ভালো হয়, যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খুব জরুরি। হাঁটলে মানসিক অভিঘাতের জগদ্দল পাথর উবে গিয়ে এক ফুরফুরে অনুভব তৈরি হয়, যা ডায়াবেটিসসহ অনেক রোগ প্রশমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু শরীরচর্চা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেই ক্ষেত্র বিশেষে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ডায়াবেটিস রোগী কখন হাঁটবেন

সকাল-বিকেল-রাত্রি যেকোনো সময় হাঁটা যায়। তবে হাঁটার জন্য নির্ধারিত সময় থাকা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই জরুরি। সকালে হাঁটুন। টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীদের সকালে হাঁটা উত্তম। সময় না পেলে তিন বেলা খাবারের এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর পনেরো-বিশ মিনিট করে হাঁটুন। খাবার খাওয়ার এক-দেড় ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ধাই ধাই করে বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস রোগীরা এ সময় হাঁটতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটার এমন অভ্যাস গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য দারুণ কার্যকর। এমনটি না পারলে বিকেলে হাঁটুন।

ডায়াবেটিস রোগী কতক্ষণ হাঁটবেন

আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন আধা ঘণ্টা করে হাঁটতে। এই হাঁটা একেবারে ঘাম ঝরানো হাঁটা। যারা স্থূলতায় আক্রান্ত তাদের জন্য হাঁটতে হবে আরও বেশি। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ ঘণ্টা জোর কদমে। হাঁটার প্রথম দিকে ৩-৫ মিনিট আস্তে ধীরে হাঁটুন। শরীরকে গরম করুন। এরপর ২০-২৫ মিনিট দ্রুত কদমে হাঁটুন। শেষ ১-৩ মিনিট শিথিল করুন হাঁটা।

হাঁটতে যাওয়ার আগে হাঁটার প্রস্তুতি

খালি পায়ে হাঁটা যাবে না। ডায়াবেটিস রোগী খালি পায়ে হাঁটতে গিয়ে মারাত্মক জখমের শিকার হতে পারেন। এ জন্য একজোড়া কেডস কিংবা জুতা নির্বাচন করুন, যা পায়ের সঙ্গে এঁটে থাকে। জুতার সঙ্গে অবশ্যই পরিষ্কার নরম মোজা পরুন। ডায়াবেটিস পরখ করে নিন হাঁটার আগে। গ্লুকোজের মাত্রা ৫.৩-এর নিচে থাকলে হাঁটতে গেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে চিনির মাত্রা কমে যেতে পারে, যা মারাত্মক হতে পারে। এমতাবস্থায় কিছু পরিমাণ শর্করা খাবার খেয়ে হাঁটতে বেরুন। চিনির মাত্রা ১৬.৭-এর ওপরে থাকলে হাঁটার ক্ষেত্রে সাবধান। কেননা এটি কিটো এসিডোসিস করতে পারে। সেজন্য হাঁটার পূর্বে চিনির মাত্রা জেনে নিন।  কমপক্ষে বড় এক গ্লাস পানি পান করুন হাঁটার পূর্বে। বেশি সময় হাঁটার পরিকল্পনা থাকলে সঙ্গে পানির বোতল রাখুন। প্রতি ২০ মিনিট হাঁটার জন্য এক কাপ পানি পান করুন। পানি শূন্যতা যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এবড়ো থেবড়ো কর্দমাক্ত পথে হাঁটবেন না। যদি সম্ভব হয় ভিড়-ভাট্টা এড়িয়ে খোলা মাঠে, পার্কে, নদী পাড়ে হাঁটুন। হাঁটার জন্য সঙ্গী নির্বাচন করুন। এতে হাঁটার মাঝে গতি আসবে, একঘেয়েমি দূর হবে।

হাঁটার সময় খেয়াল রাখুন

ইনসুলিন নিয়ে হাঁটার সময় হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয় কিনা সেদিকে খেয়াল রাখুন। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়ার নাম হাইপোগ্লাইসেমিয়া। এটি হলে বেশ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। এমনটি হলে দ্রুত কার্যকর শর্করা গ্রহণ করুন। হাঁটায় ক্ষান্তি দিন। মারাত্মক হাইপোগ্লাইমিয়ায় অজ্ঞান পর্যন্ত হতে পারে কেউ। সুতরাং নিজের শরীরের লক্ষণের প্রতি নজর দিন। দীর্ঘ পথ হাঁটতে চাইলে সঙ্গে রাখুন স্ন্যাকস, সহজপাচ্য শর্করা।