ডা. মো. জোবায়েদ মিয়া
সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর
শুচিবাই শুধু অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস নয়; এটি অনেকের দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক ও মানসিক স্বস্তিকে প্রভাবিত করা এক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। বারবার হাত ধোয়া, একই কাজ বারবার করা বা অকারণ ভয় এসব লক্ষণকে অবহেলা করা ঠিক নয়। শুচিবাই কেন হয়, কীভাবে চেনা যায় এবং চিকিৎসার উপায় জেনে নিন।
শুচিবাইকে হিককাপ অব মাইন্ড (মনের ঢেকুর) বলে। জীবনে যেকোনো সময়ে ২-৩% লোক শুচিবাইতে আক্রান্ত হতে পারে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পুরুষ ও মহিলা সমানভাবে আক্রান্ত হয়। এ রোগটি সাধারণত বেশি হয় ২০ বছর বয়সে। বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিতরা বেশি ভোগেন।
কীভাবে বুঝবেন
আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ শুচিবাইতে ভুগছে কিনা কীভাবে বুঝবেন, যা জানাও জরুরি।
এই রোগের দুটি অংশ। প্রথম অংশটি হলো বারবার চিন্তা আসা। রোগীরা প্রায়ই বলে থাকে, ডাক্তার খালি টেনশন আসে। কোনো রোগীর রাতের বেলায় বিশেষ কোনো ঘটনা অনেক বার মনে পড়ে। আবার কেউ কেউ কোনো ঘটনা
বলার জন্য স্বামীকে বারবার বিরক্ত করে, অথচ যা একবার বললেই হয়। অপর অংশটি হলো চিন্তাকে কাজের বা আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা, যাকে আমরা কম্পালশন বলি।
মাথায় সারাক্ষণ টেনশন তাকে। কেউ কেউ বলে একটা টেনশন গেলে অন্যটা আসে। কিছুক্ষণের জন্য মাথা টেনশনমুক্ত হয় না।
কেবল কল্পনা আসে।
কোনো রোগীর তীব্র ইচ্ছা হয় অন্যকে ইনজুরি করা, গাড়ির নিচে ঝাঁপ দেওয়া, বিশেষ কোনো জায়গায় গেলে ভয় পায়, এটাকে অবসেশনাল ফোবিয়া বলে।
কেউ আবার একই ভঙ্গিতে থাকবে এবং ঘরের কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখবে। একটু এদিক-ওদিক হলে সবার সঙ্গে ঝগড়া লাগিয়ে দেবে।
কারও কারও গোসল করতে অনেক সময় লাগে।
এটা যে একটা অমূলক চিন্তা রোগীরা বুঝতে পারে এবং শত চেষ্টা করেও মাথা থেকে বাদ দিতে পারে না। কেউ কেউ বলে একটা কিছু মাথায় ঢুকলে চরকার মতো ঘুরতে থাকে।
বাচ্চাদের উপসর্গগুলো আলাদা হয়। বারবার ওয়াশিং, চেকিংয়ের কোনো কিছু টাচ করার প্রবণতা থাকে। আর বেশি অবসেশন হয় জীবাণুর ও ডিজএস্টরের ভয়। তবে ছোটদের বেলায় বাধা দেওয়ার ইচ্ছা নাও থাকতে পারে।
শুচিবাইর কারণে রোগীর যে সমস্যা
মেয়েদের মাসিকের সময় অস্বস্তি বেড়ে যায়।
ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যাদের শুচিবাই আছে তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ে।
কোনো কাজ সম্পন্ন করতে অনেক সময় লাগে, পরীক্ষার সময় ছাত্রছাত্রী পেছনের পাতায় কি লিখেছে বারবার চেক করে। এ কারণে পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বরের উত্তর লিখে আসতে পারে না।
বিষণœতায় ভোগে অনেক বেশি রোগী।
কাজকর্মে ধীরগতি দেখা যায়।
ঘুমের সমস্যা হয়।
বিবাহিত জীবনে সম্পর্কের অবনতি হয়। এর ফলে ডিভোর্স রেট বেড়ে যায়।
চিকিৎসা
সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে অধিকাংশ শুচবাইয়ের রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। যে রোগীর সমস্যা এক বছরের বেশি সময় ধরে থাকে তারা দীর্ঘস্থায়ী রোগী হিসেবে ধরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। রোগীর যদি নির্দিষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায়, আগে চিকিৎসা শুরু হয়, ব্যক্তিত্ব ভালো থাকে। উপসর্গগুলো অল্পদিন ধরে শুরু হয়ে থাকে এবং বেশি বয়সে হয় তাহলে উন্নতি বেশি হয়। শুচিবাইয়ের চিকিৎসায় ১. ওষুধ, ২. বিহেভিয়ার থেরাপি, ৩. কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন হয়। শুচিবাইয়ের চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর হলো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (ঈইঞ), বিশেষ করে এক্সপোজার অ্যান্ড রেসপন্স প্রিভেনশন (ঊজচ)। প্রয়োজন হলে উদ্বেগ কমাতে ওসিডির জন্য নির্ধারিত ওষুধও দেওয়া হয়। সময়মতো চিকিৎসা ও পরিবারের সহযোগিতা পেলে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। ওষুধ সাইকিয়াট্রিস্টদের পরামর্শ শুরু ও চালিয়ে যাওয়া এবং মাঝে মধ্যে ফলোআপেরও দরকার হয়।