ডা. নাসির আহমেদ
কিডনি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল
বর্ষায় নানা ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রমণ রোগ দেখা দেয়। কয়েক দিন ধরে জ্বর, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা গলাব্যথা এসব উপসর্গ নিয়ে অনেকেরই জ¦র হয়। অনেকেই মনে করেন, সব জ্বরই হয়তো ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া। আবার কেউ সাধারণ ভাইরাল জ্বরকেও অবহেলা করেন। বাস্তবতা হলো, বর্ষাকালে ভাইরাল জ্বর খুবই সাধারণ হলেও সব জ্বরকে একইভাবে দেখা উচিত নয়। কিছু লক্ষণ স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়, আবার কিছু লক্ষণ দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
ভাইরাল জ্বর
ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াকে ভাইরাল জ্বর বলা হয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যাডেনো ভাইরাস, রাইনো ভাইরাস, করোনা ভাইরাসসহ বিভিন্ন ভাইরাস এ ধরনের জ্বরের কারণ হতে পারে। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বৃদ্ধি, জমে থাকা পানি এবং মানুষের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকার কারণে ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ ভাইরাল জ্বরের ক্ষেত্রে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে। অধিকাংশ রোগী ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ
ভাইরাল জ্বরের উপসর্গ ব্যক্তি ও ভাইরাসভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত দেখা যায় ১০০ থেকে ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর, শরীর ও পেশিতে ব্যথা হওয়া, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ, শুকনো কাশি, দুর্বলতা ও ক্লান্তি এবং ক্ষুধামন্দা ভাব দেখা দেয়। এসব উপসর্গ থাকলেও রোগী যদি স্বাভাবিকভাবে পানি পান করতে পারেন, শ্বাসকষ্ট না থাকে এবং ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হয়, তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই।
যখন সাধারণ থাকে না
বর্ষাকালে ভাইরাল জ্বরের পাশাপাশি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড কিংবা নিউমোনিয়ার মতো রোগও হতে পারে। তাই কিছু সতর্ক সংকেত কখনোই অবহেলা করা যাবে না। যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে তাহলো জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হওয়া বা বারবার ফিরে আসা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, বারবার বমি হওয়া, অতিরিক্ত ঝিমুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ, খিঁচুনি,তীব্র মাথাব্যথা বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, শরীরে লালচে দাগ বা রক্তক্ষরণের লক্ষণ, প্রস্রাব কমে যাওয়া, প্রচন্ড পেটব্যথা, শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর। এসব উপসর্গ জটিল সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে। তাই দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।
ডেঙ্গু নাকি সাধারণ ভাইরাল জ্বর
বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয় ডেঙ্গু নিয়ে। ডেঙ্গুতেও জ্বর, শরীরব্যথা ও দুর্বলতা থাকে। ডেঙ্গুতে সাধারণত তীব্র শরীরব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, প্লেটলেট কমে যাওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া সব সময় সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।
চিকিৎসা
ভাইরাল জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা নেই। কারণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন ক্ষতিকর হতে পারে এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়ায়।
যা করবেন
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, প্রচুর পানি, ওরস্যালাইন, স্যুপ ও তরল খাবার গ্রহণ, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বরের ওষুধ খাওয়া, শরীরের তাপমাত্রা ও প্রস্রাবের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা। ওষুধ দেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন
ভাইরাল জ্বর পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দিতে পারে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, অসুস্থ ব্যক্তির কাছাকাছি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাদ্য গ্রহণ, বিশুদ্ধ পানি পান করা, ঘরের আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, যাতে মশার বংশবিস্তার না হয়।