ত্রাণ যাচ্ছে না দুর্গম এলাকায় লাশ দাফনেও সংকট

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে চট্টগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমনকি লাশ দাফনেও দেখা দিয়েছে সংকট। সরকারি নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এনজিও এবং ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও দুর্গত মানুষের অভিযোগ, ত্রাণের বড় অংশই মূল সড়ক ও সহজে পৌঁছানো আশ্রয়কেন্দ্রকেন্দ্রিক। ফলে পানিতে বিচ্ছিন্ন ভেতরের গ্রামগুলোর বহু পরিবার এখনো অনাহার, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ওষুধের অভাবে দিন কাটাচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ছোট যানবাহনে ত্রাণ নিয়ে আসা স্বেচ্ছাসেবীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপজেলা সদর কিংবা প্রধান সড়ক পর্যন্তই যেতে পারছেন। নৌকার স্বল্পতা, প্রবল স্রোত, ভাঙা সড়ক এবং দুর্গম এলাকার পথ না চেনার কারণে অনেকেই ভেতরের গ্রামগুলোতে পৌঁছাতে পারছেন না। এতে সড়কসংলগ্ন এলাকার মানুষ একাধিকবার ত্রাণ পেলেও দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা পরিবারগুলো এখনো অপেক্ষায় রয়েছে।

গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় আছে। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ২২ হাজার ১০০ জন দুর্গত মানুষ। এই দুর্যোগে মারা গেছেন ১৩ জন।

সাতকানিয়ার পানিবন্দি পরিবারের অনেক সদস্য জানান, কাঞ্চনা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নোয়াপাড়া, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাইপাড়া, ঢেমশা, নলুয়া, আমিলাইশ, বড়ুয়াপাড়া, হিন্দুপাড়া, ছদাহা ইউনিয়নের বিচিন্নপাড়া, গাটিয়াডেঙ্গা, ডলুকুল, চরতি, রামপুর, এওচিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা, ইচামতি, আলীনগরে বুক থেকে গলা সমান পানি উঠেছে। অনেকের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে, অনেকে ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও বের করতে পারেননি। কিন্তু এসব এলাকায় এখন পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করেন বাসিন্দারা। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাজিরপাড়া, চরতি ইউনিয়নের উত্তর রামপুর, দক্ষিণ আমিলাইশ এবং সাতকানিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দুপাড়া, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোয়ালিয়াপাড়া, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রূপকানিয়া এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খলিফাপাড়ার বাসিন্দারা। তাদের দাবি, কয়েক দিন ধরে তারা শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অপেক্ষায় রয়েছেন।

এ বিষয়ে দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা দলের নির্দেশে সব গ্রামে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু এমন কিছু গ্রাম আছে যেখানে যোগাযোগের সব মাধ্যম নষ্ট হয়েছে, বা পৌরসভা থেকে অনেক দূর হওয়ায় সেসব স্থানে ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লাগছে। তবে আমরা সবাইকে নিয়ে সমন্বয় করে ত্রাণগুলো প্রতিটি বাড়িতে পৌঁছে দেব।

একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পাচ্ছে এ বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ আনছে কিন্তু তার আগেও অন্য কেউ এসে একই ব্যক্তিকে ত্রাণ দিয়ে গেছে এ সব কারণে একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পাচ্ছে। আর ভেতরের গ্রামগুলোয় যাওয়ার পথ অনেকে না চেনায় এই সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি প্রত্যন্ত গ্রামে যাতে সরকারি ত্রাণ ও বেসরকারি ত্রাণ সবার হাতে যায়।

লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া, চরম্বা ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের প্লাবিত গ্রামগুলো থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান সড়কে ত্রাণ কার্যক্রম দৃশ্যমান হলেও ভেতরের পাড়া-মহল্লার অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য দুধ, শুকনা খাবার এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল, বৈলতলী ও হাশিমপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম থেকেও দুর্গত মানুষ জানিয়েছেন, নৌযানের সংকটের কারণে ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।

বাঁশখালীর ছোট ছনুয়া, জালিয়াঘাটা, ইলশা, সরল হারুনের পশ্চিমপাড়া, মিঞ্জিলতলা, খালাইচ্ছার দোকানসংলগ্ন ভেতরের এলাকা এবং পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গ্রামের মানুষও এখনো ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অনেকে ত্রাণ পেলেও সেসব ত্রাণ সবার জন্য পর্যাপ্ত না বলেও জানান সেখানের বাসিন্দারা।

এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত ১০০ টন চালের বরাদ্দ পেয়েছি এবং তা যথাযথ ভাবে বণ্টন করা হচ্ছে। তবে যে পরিমাণ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত সরকারি বরাদ্দ থেকে একসঙ্গে সবাইকে সহযোগিতা করাটা কঠিন। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চা চেষ্টা করছি যাতে সরকারি সহায়তা থেকে কেউ বাদ না যায়। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিপর্যায়ে বা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে যারা ত্রাণ নিয়ে আসছে তারা গ্রামের ভেতরে যেতে না পারায় আমরা একটা পরিকল্পনা করেছি। এতে আমাদের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ইউনিয়নে ট্যাগ অফিসার হিসেবে রাখব। এতে বাইরে থেকে যারা ত্রাণ নিয়ে আসবে তারা সে ট্যাগ অফিসারের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামে ত্রাণগুলো পৌঁছে দেবে।

বাঁশখালীর বাসিন্দা আকিব বলেন, ‘চট্টগ্রাম, ফেনীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকেই ত্রাণ নিয়ে আসছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ত্রাণই সড়কের পাশে বা সহজে যাওয়া যায় এমন গ্রামগুলোতে বিতরণ করা হচ্ছে। ফলে একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পাচ্ছেন, অথচ ভেতরের গ্রামগুলোতে নৌকা ও পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক না থাকায় মানুষ এখনো না খেয়ে আছে।’ তিনি আরও বলেন, খাদ্যের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ নলকূপ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানীয় জলের উৎস নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীরা।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বপ্নযাত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রুবেল মাহমুদ বলেন, এটা ঠিক যে অনেক সংগঠন ত্রাণ নিয়ে মহাসড়ক পর্যন্ত বা তার আশপাশের গ্রামে দিয়ে চলে যাচ্ছে। তারা আর ভেতরে যেতে পারছে না তাই দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ যেতে পারছে না বা যাচ্ছে সেজন্য অনেক সময় লাগছে। এর অন্যতম কারণ হলো যারা ত্রাণ নিয়ে আসছে তারা সবাই অন্য জেলার বাসিন্দা তারা কেউ গ্রামগুলোর ব্যাপারে তথ্য না নিয়ে চলে আসছে বা এখানে কোনো প্রতিনিধি না রাখায় তারা মহাসড়ককেন্দ্রিক পথে বা গ্রামে ত্রাণ দিয়ে চলে যাচ্ছে। আবার অনেকে ত্রাণ নিয়ে এলেও নৌকা না পাওয়ায় বা ভাড়া বেশি চাওয়ায় কেউ আর ভেতরের গ্রামগুলোয় যেতে পারছে না।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গম এলাকায় নৌকার মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দিতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে যেসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছেনি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্যায় তলিয়ে গেছে কবরস্থান : সাতকানিয়া প্রতিনিধি জানান, উপজেলার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, উঠান-সবকিছুই পানির নিচে। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানও তলিয়ে গেছে বন্যায়। ফলে মৃত্যুর পর প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানাতেও দুর্ভোগে পড়ছেন স্বজনরা। লাশের গোসল, দাফন সবই সম্পন্ন করতে হচ্ছে বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফোরকান গত শুক্রবার বিকেলে মারা যান। কিন্তু তার মৃত্যুর পর দাফন-কাফন নিয়ে বিপাকে পরেন স্বজনরা। কয়েক দিনের টানা বন্যায় ফোরকানের বসতঘরের উঠান থেকে পারিবারিক কবরস্থান-সবখানে কোমর সমান পানি। ফলে মৃতের লাশের গোসল বাড়িতে দেওয়া সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে পূর্বপুরুষদের কবরের পাশেও তাকে দাফনের সুযোগ ছিল না। স্বজনরা জানান, মৃতদেহ একটি ভেলায় ভাসিয়ে নেওয়া হয় প্রায় তিনশ মিটার দূরের এক শুকনা স্থানে। সেখান থেকে অটোরিকশাযোগে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের দস্তিদারহাট এলাকায় নিয়ে সম্পন্ন হয় লাশের গোসল, কাফন ও জানাজা।

পরে পারিবারিক কবরস্থানের পরিবর্তে কাছের একটি পাহাড়ের সরকারি খাসজমিতে তাকে দাফন করা হয়। ফোরকানের ছেলে রাসেল উদ্দিন বলেন, ‘বাড়ির সঙ্গেই পারিবারিক কবরস্থান। সেখানেই দাদা-দাদিসহ পরিবারের অন্যদের কবর। মৃত্যুর আগে বাবাও বলেছিলেন, তাকে যেন পারিবারিক কবরস্থানেই দাফন করা হয়। কিন্তু বন্যার কারণে তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পারিনি।

কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। ফোরকানের বাড়ি, চলাচলের রাস্তা ও পারিবারিক কবরস্থান পানির নিচে থাকায় মরদেহ ভেলায় ভাসিয়ে শুকনো স্থানে নিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ফোরকানের দাফনের এই ঘটনা সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার এক মর্মস্পর্শী চিত্র।