মুসলিম জাগরণের কবি

বাংলায় মুসলিম সমাজের নবজাগরণে যাদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাদের অন্যতম সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও সমাজচিন্তক। তার সাহিত্যকর্মের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজকে আত্মপরিচয়ের বোধে জাগিয়ে তোলা, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করা এবং স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় অনুপ্রাণিত করা।

ইসমাইল হোসেন সিরাজীর জন্ম ১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই সিরাজগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষা ও বাংলা-ফারসি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি স্বশিক্ষায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্মচিন্তা ও সমকালীন রাজনীতি সম্পর্কে তার আগ্রহ ক্রমেই তাকে একজন সচেতন লেখক ও সমাজসংস্কারকে পরিণত করে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার মুসলমানরা শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতিতে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। এই বাস্তবতা সিরাজীকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নতির জন্য আত্মবিশ্বাস, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং স্বাধীন চিন্তার বিকাশ অপরিহার্য। তাই তার সাহিত্য হয়ে উঠেছিল জাতিকে জাগিয়ে তোলার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

তার সর্বাধিক পরিচিত কাব্যগ্রন্থ ‘অনল-প্রবাহ’ প্রকাশিত হয় ১৯০০ সালে। এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে তিনি মুসলমানদের উদ্দেশে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। ‘আর ঘুমিও না নয়ন মেলিয়া, উঠরে মোসলেম উঠরে জাগিয়া’, এ ধরনের বিখ্যাত পঙ্্ক্তিগুলো একসময় বাংলার মুসলিম সমাজে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। তার কবিতায় ধর্মীয় চেতনা, আত্মমর্যাদাবোধ, দেশপ্রেম ও সংগ্রামের আহ্বান একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।

কাব্যচর্চার পাশাপাশি উপন্যাস রচনায়ও তিনি বিশেষ সাফল্যের পরিচয় দেন। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘রায়নন্দিনী’, ‘তারাবাঈ’, ‘ফিরোজা বেগম’, ‘নূরউদ্দীন’ ও ‘জাহানারা’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’-এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি ‘রায়নন্দিনী’ রচনা করেন। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’র সমসাময়িক পরিমণ্ডলে তিনি ‘প্রেমাঞ্জলি’ প্রকাশ করেন। তার সাহিত্যকর্মে মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনার শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে।

ইসমাইল হোসেন সিরাজী ছিলেন একজন বলিষ্ঠ প্রাবন্ধিকও। ‘স্বাধীন চিন্তাশীলতা’, ‘মাতৃভাষা ও জাতীয় উন্নতি’, ‘আত্মত্যাগ ও জাতীয় উন্নতি’, ‘সাহিত্যের প্রভাব ও প্রেরণা’, ‘জাতীয় জীবনে স্বাধীনতার প্রয়োজন’, ‘স্বরাজ ও হিন্দু-মুসলমান’, ‘ইসলাম ও ধনবল’এবং ‘আত্মবিশ্বাস’সহ অসংখ্য প্রবন্ধে তিনি শিক্ষা, সমাজ, রাষ্ট্র, সাহিত্য ও ইসলামের নানা দিক নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তার প্রবন্ধে যুক্তিবাদ, আত্মমর্যাদা ও কর্মপ্রেরণার সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

সাংবাদিকতায়ও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন এবং নিজেও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৩ সালে তিনি মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সঙ্গে যৌথভাবে সাপ্তাহিক ‘ছোলতান’ সম্পাদনা করেন। এর আগে ও পরে বিভিন্ন সাময়িকীতেও তার গল্প, প্রবন্ধ ও রাজনৈতিক লেখা প্রকাশিত হয়। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি মুসলিম সমাজের অধিকার, শিক্ষা বিস্তার এবং জাতীয় চেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করেন।

তিনি মুসলিম বিশে^র ঐক্য সাধনে নিমগ্ন ছিলেন। এ ক্ষেত্রে সৈয়দ জামাল উদ্দিনের চিন্তা তাকে প্রভাবিত করেছিল। তবে পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আত্মজাগরণের ক্ষেত্রে শিবলী নোমানী এবং আল্লামা ইকবালের চিন্তাধারা তার ওপর আরও গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে তার লেখায় ধর্মীয় চেতনার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের আহ্বান আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সাহিত্যকে ইসলামি সাহিত্যধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তার রচনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রবল জাতীয় চেতনা। এক্ষেত্রে আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও শিক্ষার ভিত্তিতে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার আকাক্সক্ষাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।

ব্রিটিশবিরোধী চেতনা এবং মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলার কারণে তাকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবু তিনি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। সাহিত্যকে তিনি কখনো নিছক বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং জাতি গঠনের শক্তিশালী উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘জাহানারা’ তার শেষ দিকের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি সাহিত্যচর্চা, সমাজচিন্তা এবং মুসলিম সমাজের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সাহিত্য ও চিন্তা আজও বাংলা মুসলিম সমাজের ইতিহাসে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার