ক্যাম্পাসের গল্প নিয়ে হাজির ইয়ারাতা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের পাঁচ বন্ধু। তারা কনটেন্ট ক্রিয়েটর। পেজের নাম ইয়ারাতা yarata)। স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে, অভিনয়, ভিডিওগ্রাফি, এডিটিং, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজ করা সব করেন নিজেরাই। বুদ্ধিদীপ্ত কনটেন্ট আর সহজ-সরল বিদ্বেষমুক্ত বিষয় দিয়ে সাড়া ফেলেছেন নেট দুনিয়ায়।

তারা ক্যাম্পাস জীবনকেই করে তুলেছেন তাদের কনটেন্টের উপজীব্য। তাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন এনাম-উজ-জামান

একটা সময় ছিল যখন এক জীবনে বহুজীবনের গল্পের খোঁজ পেতে মানুষ গল্প-উপন্যাস-নাটকের দ্বারস্থ হতেন। টেলিভিশন যুগে এই অভ্যাসে পরিবর্তন এলো বড় ধরনের। বইয়ে পড়া চরিত্রগুলো বাস্তব চরিত্র হয়ে সামনে হাজির হলো। বইয়ের কাটতিকেও প্রভাবিত করতে শুরু করল এই টেলিভিশনের নাটক-সিনেমা। তথ্য-প্রযুক্তির হাত ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিপণন থেকে শুরু করে বিনোদন, সামাজিকতা, সবকিছুর যখন আমূল পরিবর্তন হলো, এক জীবনে বহুজীবনের গল্প খোঁজার মাধ্যমেরও হলো পরিবর্তন। প্রথমে ফেসবুক স্ট্যাটাস স্থান করে নিল বইয়ের বিকল্প হিসেবে আর এখন শর্ট ভিডিও, রিলস স্থান করে নিয়েছে টেলিভিশনের নাটক-সিনেমার বিকল্প হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যারা যুক্ত আছেন তারা একই সঙ্গে উৎপাদক ও ভোক্তা। যারা ভিন্ন ধরনের বিষয় আর আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে উপস্থাপন করতে পারেন তাদের লেখা বা ভিডিও (কনটেন্ট) তারা বেশি ফলোয়ার, লাইক-কমেন্ট পান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেন মৌলিক কনটেন্টকে। এ জন্য অনেকেই নিজেদের যাপিত জীবনকেই কনটেন্ট আকারে পরিবেশন। নিজেদের ক্যাম্পাস জীবনকেই সরস স্ক্রিপ্টের মাধ্যমে নেটিজেনদের সামনে তুলে ধরেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী। তাদের পেজের নাম yarata। ৯ লাখ ২৩ হাজারের বিশাল ফলোয়ারের পরিবার তাদের। নেই বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট, নেই অশ্লীলতা। সৃজনশীলতাই তাদের চালিকাশক্তি।

yarata? এ কেমন নাম?

মানুষ যেসব কনটেন্ট পছন্দ করে সেগুলো অন্যদের নিউজফিডেও সাজেশন হিসেবে পাঠায়। এভাবে হয়তো ইয়ামিন, রেজোয়ানদের শর্ট ভিডিও আপনার নিউজফিডেও এসেছে। দু-একটি ভিডিও দেখার পরে ফলো অপশনে চাপ দিয়ে ফলোয়ারও হয়েছেন। আড্ডায়-গল্পে তাদের ভিডিও নিয়ে কথা বলার সময় ঘটে বিপত্তি। পেজের নামটি যখন কাউকে বলতে যান, চট করে মনে পড়তে চায় না। বেশ ভালো করে খেয়াল করে, মুখস্থ না করলে মনে রাখা কষ্ট। প্রথম ধাক্কায় মনে হয় কোনো তামিল বা তেলেগু সিনেমার নাম থেকে অনুপ্রাণিত। অজান্তেই মনে প্রশ্ন আসে, অর্থ কী এর? নামটা একটু অদ্ভুতই। তাদের পেজের নামটি এসেছে ইয়ামিন, রাজু ও তানভীরের নামের প্রথম দুই ইংরেজি অক্ষর নিয়ে। এর নেই ভিন্ন কোনো অর্থ। তবে ফার্সি শব্দ ইয়ার কিন্তু আমাদের উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত ও ব্যবহৃত। বন্ধুদের নিয়ে, বন্ধুদের দ্বারা এবং বন্ধুদের জন্য গঠিত ও পরিবেশিত এই প্ল্যাটফরমটির নামকে যদি সেই ‘ইয়ার’ শব্দের সঙ্গে কোনো মিল রেখে স্মরণে রাখতে চান তা হলে রাখতেই পারেন। আপত্তি কী?

যেভাবে পথচলার শুরু

পাঁচ বন্ধুর মধ্যমণি বিন ইয়ামিন। মূলত তার হাত ধরেই ইয়ারাতার যাত্রা শুরু। কলেজজীবনে বিন ইয়ামিন সেলফি ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও বানাতেন। তার বাবার ভাষায় টিকটক করতেন। টিকটকারদের তিনি ভালো চোখে দেখতেন না। তার ভাষায়, ছেলে খারাপ হয়ে গেছে। এইচএসসি পরীক্ষার চাপ ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতির জন্য সে যাত্রায় ভিডিও তৈরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বন্ধুদের নিয়ে আবার শুরু করেন ভিডিও তৈরি। এ যাত্রা সঙ্গী হিসেবে পান আরও চারজনকে রাজু ইসলাম, রেজোয়ান, সাব্বির হোসেন ও সীমান্ত দত্তকে।

যেকোনো নতুন বিষয়কে চারপাশের মানুষ যেভাবে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখে সেভাবেই দেখেছিল তাদের কর্মকা-কেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে ভিডিও বানায়-এ কেমন কথা? তাও ফিটফাট হয়ে ডেইলি ভøগ না, হাইফাই রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফুড ভøগ না। ফানি ভিডিও! তবে এমন সমালোচনাকেও পাত্তা দেননি তারা। ভিডিও বানিয়ে গেছেন। কাছের বন্ধু ও উৎসাহ দেওয়ার কিছু মানুষ থাকায় নিজেদের পথে অটল থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছিল। সাধারণ মানুষ সেগুলো পছন্দ করতেও শুরু করল। আজ তাদের ফলোয়ার সংখ্যা ৯ লাখ ২৩ হাজারেরও বেশি। নেতিবাচক সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের কাজটা করে যাওয়াতেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছেন বলে মনে করেন ইয়ারাতার সদস্যরা। তবে সামনে যে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে সেটিও মাথায় রেখেছেন তারা। কাছের সেই মানুষদের তারা ভোলেননি।

জুতা সেলাই থেকে চ-ীপাঠ

পাঁচজনের এই দলটির ক্যামেরা সামনে ও পেছনের সদস্য ভিন্ন নয়। যারা ক্যামেরার সামনে সাদা রঙ মেখে অভিনয় করেন তারাই ক্যামেরা পেছনে কাজ করেন। পর্যায়ক্রমে সবাইকে ক্যামেরা সামনে ও পেছনে কাজ করে স্ক্রিপ্টের চাহিদা মেটাতে হয়। শুধু ভিডিও ধারণ নয়। ভিডিও এডিটিং থেকে শুরু করে পোস্ট প্রডাকশনে সব কাজ নিজেরাই করেন

ইয়ারাতার সদস্যরা।

শখ থেকে উপার্জন

ক্যাম্পাস জীবনে অনেকেই অভিভাবকের কাছ থেকে আর অর্থ নিতে চান না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী টেউশনি করেন। কেউ  কোচিং সেন্টারে পড়ান। তথ্য-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে আমাদের দেশের তরুণদের সামনে খুলে গেছে সম্ভাবনার নানা পথ। ফ্রি-ল্যান্সিং করে অনেকেই নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাবা-মাকেও সাহায্য করতে পারছেন। কনটেন্ট তৈরি করেও আয়-উপার্জন করা যায়। মেটা-ইউটিউব ভিউয়ের ওপর ভিত্তি করে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অর্থ প্রদান করে। তা ছাড়া স্পন্সর ও কোলাবরেশনের মাধ্যমেও অনেকে আয় করে থাকেন। ভিডিও তৈরি প্রথমে ইয়ামিনদের শখ থাকলেও পরে এটি থেকে আয় করতে শুরু করেন তারা। খুব বেশি না হলেও নিজের খরচ চালানোর মতো আয় করেন বলে জানান তারা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পড়াশোনা-অ্যাসাইনমেন্ট সবকিছু সামলিয়ে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করতে হয় বলে খুব বেশি ভিডিও দিতে পারেন না তারা। তবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেন শক্তভাবে। অন্যরা যখন ক্লাসের পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসে অংশ নিত তারা তখন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ভিডিও তৈরি করতেন বা চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ হয়ে ভিডিও এডিট করতেন। এটিকেই পেশা হিসেবে না নিলেও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন তারা পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরেও। সঙ্গে চলবে বিষয়ভিত্তিক পেশাজীবন।