মধ্যপ্রাচ্যের ৫ দেশে একযোগে হামলা ইরানের, বন্ধ ঘোষণা হরমুজ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে তেহরান।

রোববার (১৩ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও দেশটির কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র টানা তৃতীয় দফায় দক্ষিণ ইরানের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাব এবং ওই অঞ্চলে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করতেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে।

এর জবাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করে।

যেসব দেশে হামলার দাবি

আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী—

কাতার: কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সেখানে যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন।

ওমান: ওমানের দুকম বন্দরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জ্বালানি ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।

কুয়েত: কুয়েতে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার স্টেশন ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে বিস্ফোরক ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান।

বাহরাইন: বাহরাইনে মার্কিন সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।

জর্ডান: জর্ডানে প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে কমান্ড সেন্টার ও এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংসের দাবি করেছে তেহরান।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা

ইরান ঘোষণা দিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম—প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, না হলে মূল্য দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত সপ্তাহে তিন দফার অভিযানে ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌ সক্ষমতা, গোলাবারুদের গুদাম, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র ছিল।

সেন্টকমের দাবি, তিন রাতের অভিযানে ৩০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরানের কমে আসে।

ইরান বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে সব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি। কাতার জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। অন্য দেশগুলোর পক্ষ থেকেও ইরানের দাবির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা