শিপলুর ড্রাগন বাগান কৃষি সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

বেসরকারি চাকরির পাশাপাশি ড্রাগন ফল চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন জয়পুরহাটের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা হেদায়েত হোসেন শিপলু। তার ৪৫ বিঘার ‘গ্যালাক্সি ড্রাগন বাগান’ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে দেশসহ বিদেশে। পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের কাক্সিক্ষত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ উদ্যোক্তা শিপলুর। আর নানা রকম পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা।

জয়পুরহাটের পাঁচবিবির কোকতাড়া তালতলী এলাকায় ছোট যমুনা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে ৪৫ বিঘার বিশাল ড্রাগন ফলের রাজ্য। ২০২৩ সালে ১ লাখ চারা রোপণ করে বাগানটি শুরু করেন তরুণ উদ্যোক্তা শিপলু। বছর ঘুরতেই তার ড্রাগন বাগানে ফল ধরতে শুরু করে। ২০২৪ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ করে এসেছে কাক্সিক্ষত সফলতা। বর্তমানে গাছে ঝুলছে লাল টকটকে ড্রাগন ফল। তিনি নিজেও যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি তার বাগানে প্রায় ১০০ জন আদিবাসী ও স্থানীয় নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তার এই সফলতা দেখে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন ড্রাগন বাগান করতে। গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ ভালো হওয়ায় তার বাগান থেকে উৎপাদিত ড্রাগন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহ হচ্ছে দেশে ও বিদেশে। বর্তমানে প্রকারভেদে তার বাগানের প্রতি কেজি ড্রাগন বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে ১০০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত। ফলনের ৫ মাসে শিপলু আশা করছেন এবার তার বাগান থেকে ২০০ মেট্রিক টন ড্রাগন উৎপাদন হবে।

দূর থেকে অনেকেই শিপলুর বাগান দেখতে আসেন। আমদই গ্রামের তারিকুল ইসলাম তেমনি একজন দর্শনার্থী।

তিনি বলেন, এই ড্রাগন বাগানের কথা অনেক দিন থেকে শুনছিলাম, আজ দেখতে আসলাম। অনেক বড় পরিসরে এই বাগান। অনেক ভালো লাগছে, ড্রাগনগুলোও মিষ্টি। বাড়ির জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাব।

জয়পুরহাট শহরের জানিয়ার বাগান এলাকার নুর ইসলাম নুরা বলেন, ফেসবুক থেকে এই ড্রাগন বাগানের কথা জানতে পেরেছি। এরপর দেখার জন্য এসেছি। এত বড় ৪৫ বিঘা ড্রাগন বাগান আর কোথাও দেখিনি।

সন্ধ্যা খালকো ও মঙ্গলী তপ্প বাগানের আদিবাসী শ্রমিক। তারা বলেন, এই বাগানে ৭০ জনের মতো আদিবাসী নারী-পুরুষ কাজ করি। পাশাপাশি অনেক বেকারের এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার আয় দিয়ে আমাদের সংসার চলে ও ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে।

হেদায়েত হোসেন শিপলু বলেন, আমি কৃষক ঘরের সন্তান। বেসরকারি চাকরির পাশাপাশি কিছু করা যায় কিনা, সেই চিন্তা থেকে এই বাগান শুরু করি। আমার বাগানে ১ লাখের বেশি ড্রাগন গাছ রয়েছে। বাগানে থাই রেড, ভিয়েতনাম, বারি ১, বোল্ডার, পিঙ্ক রোজ, ইয়েলো ড্রাগন, পালোরা প্রজাতির ড্রাগন আছে। নিরাপদ উপায়ে ফরমালিনমুক্ত ড্রাগন চাষ করা হয়। এখানকার ড্রাগন দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ করা হয়। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে এই বাগান আরও বড় করার পরিকল্পনা আছে।

 জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম শিপলুর সাফল্যকে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন। তাকে অনুসরণ করে অন্যদের স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ দিয়ে বলেন, ড্রাগন পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি ফল। জয়পুরহাটে প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে পাঁচবিবি উপজেলার শিপলু বড় বাগান করেছেন ও ভালো ফলন পাচ্ছে। তার সফলতা দেখে অন্য কৃষকরাও এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আমরা কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ দিচ্ছি।

এ ব্যাপারে জয়পুরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক মাসুদ রানা প্রধান বলেন, এই ড্রাগন বাগানের খবর শুনে বাগানটি পরিদর্শন করেছি। এমন প্রত্যন্ত একটি এলাকায় এত বড় ড্রাগন বাগান শিপলুর উদ্যোগে করা হয়েছে, এটা নজিরবিহীন। এখানকার ড্রাগন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। এটা জয়পুরহাট জেলার জন্য কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনার একটি নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য সহযোগিতা করা হবে। শিপলু এই কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ায় জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনিও সহযোগিতা করতে চেয়েছেন।