ব্যাংকের এটিএম কার্ড ব্যবহারে ইসলামের নির্দেশনা

আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা মানুষের লেনদেনের ধরনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি ছোট্ট ইলেকট্রনিক চিপ সংযুক্ত পলিমারের কার্ডই নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। ফলে অর্থ বহন, সংরক্ষণ ও ব্যয়ের পদ্ধতিতে এসেছে নতুন মাত্রা। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বহুল প্রচলিত কার্ড সেবাগুলোর মধ্যে ভিসা, মাস্টারকার্ড এবং আমেরিকান এক্সপ্রেস উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন ব্যাংক তাদের সুবিধা ও চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন কোম্পানির কার্ড ব্যবহার করে থাকে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিসা কার্ডের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ভিসা কার্ডের আওতায় সাধারণত তিন ধরনের সেবা প্রদান করা হয়। ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড এবং প্রিপেইড কার্ড। প্রতিটি কার্ডের কার্যপদ্ধতি, ব্যবহার ও ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের সম্পর্কের ধরন ভিন্ন হওয়ায় ইসলামের বিধান সম্পর্কেও আলাদা আলোচনা প্রয়োজন। 

ডেবিট কার্ডের পরিচয় : ডেবিট কার্ড গ্রাহকদেরকে সেভিং অ্যাকাউন্ট থেকে লেনদেনের সুযোগ দেয়। এক্ষেত্রে লক্ষনীয় বিষয় হলো, যে পরিমান ক্যাশের সুবিধা সে নিতে চাচ্ছে সে পরিমান ক্যাশ উক্ত একাউন্টে থাকতে হবে।

ক্রেডিট কার্ডের পরিচয় : আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের যোগ্যতার ভিত্তিতে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে গ্রাহক কেনাকাটা করতে পারেন। আবার এটিএম বুথ থেকে নগদ অর্থও উত্তোলন করা যায়। তবে এর জন্য ব্যাংক নির্ধারিত হারে সুদ দিতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত ৪৫ দিন) বিনা সুদ বা মাশুলে সেই অর্থ পরিশোধ করা যায়। সহজ কথায় এটি একপ্রকার ঋণ।

প্রিপেইড কার্ড : প্রিপেইড কার্ডগুলো ডিপোজিট ব্যালেন্স বা ক্রেডিট কার্ড অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত নয়। এই কার্ডগুলোর বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আগে থেকেই ভরা থাকে। এটি ক্রেডিট সীমা হিসাবে কাজ করে। অর্থাৎ কার্ডধারী এই সীমার বেশি খরচ করতে পারেন না।

বাংলাদেশে বর্তমানে মূলত তিন ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। ১. পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক। ২. কনভেনশনাল (সুদভিত্তিক) ব্যাংক। ৩. কনভেনশনাল ব্যাংক, যেগুলোর কিছু শাখা বা উইন্ডোতে ইসলামি ব্যাংকিং সেবা চালু রয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে কনভেনশনাল ব্যাংকের মূল কার্যক্রম সুদভিত্তিক হওয়ায় সেখানে হিসাব (অ্যাকাউন্ট) খোলা বৈধ নয়। কারণ, অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে এমন একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যার ভিত্তি সুদি লেনদেন ও সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ইসলামে যেমন সুদ গ্রহণ ও প্রদান উভয়ই কঠোরভাবে হারাম, তেমনি সুদি চুক্তি সম্পাদন, তার সাক্ষী হওয়া কিংবা সেই ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হওয়াকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই কারণে যদি কনভেনশনাল ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা বৈধ না হয়, তাহলে সেই অ্যাকাউন্টের ভিত্তিতে প্রদত্ত বিভিন্ন ব্যাংকিং সুবিধা ও কার্ড ব্যবহারের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। কেননা ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড কিংবা প্রিপেইড কার্ড মূলত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের চুক্তিগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে প্রদান করা হয়। বিশেষত ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে সুদের শর্ত সরাসরি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত থাকে। আর ডেবিট কার্ড ও প্রিপেইড কার্ডও কনভেনশনাল ব্যাংকের সুদভিত্তিক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়ায় সেগুলোর ব্যবহারও বৈধ নয়। সুতরাং এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কনভেনশনাল ব্যাংকের ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড এবং প্রিপেইড কার্ড, কোনোটিই ব্যবহার করা ইসলামসম্মত নয়।

তবে কখনও কখনও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ে। তখন অন্য কোনো উপায়ে সমাধান নাও হতে পারে। যেমন হোটেল বুকিং, ফ্লাইট টিকিট, বিদেশি সাবক্রিপশন ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো, ‍উপরোক্ত অবস্থায় আমাদের করনীয় কি?

মুফতি তাকি ওসমানি বলেছেন, যদি ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভব না হয়, যাতে ক্রেডিট কার্ডের বিল সরাসরি কার্ডধারীর হিসাব থেকে পরিশোধ হয়ে যায়, অথচ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের বাস্তব ও তীব্র প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে এ আশা করা যায় যে, ব্যক্তি যদি কেবল প্রয়োজনের তাগিদে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিল পরিশোধ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে উক্ত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ করে, তবে আল্লাহর নিকট সে মাজুর (অপারগ) হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে এ সুযোগ তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন সে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবে যাতে কোনো অবস্থাতেই সুদ পরিশোধ করতে না হয়।

সারকথা হলো, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা বৈধ নয়, যদি এর সঙ্গে সুদভিত্তিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হয়, যদিও ব্যবহারকারীর ইচ্ছা থাকে যে তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিল পরিশোধ করবেন। কারণ কোনো লেনদেনের বৈধতা বা অবৈধতা নির্ধারণে চুক্তির প্রকৃতি একটি মৌলিক বিষয়। এখানে চুক্তিটিই সুদভিত্তিক, আর সুদভিত্তিক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া একটি স্বতন্ত্র গুনাহ।

এ কারণেই সাধারণ ব্যাংকে কেবল সুদের অর্থ সদকা করে দেওয়ার নিয়ত থাকলেও সেখানে সুদভিত্তিক হিসাব খোলা বৈধ হয় না। তবে কখনো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যখন ক্রেডিট কার্ড ছাড়া প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত শর্তসাপেক্ষে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বৈধ হতে পারে।

১. কোনো ইসলামসম্মত বিকল্পের মাধ্যমে প্রয়োজন পূরণ সম্ভব না হওয়া।

২. ক্রেডিট কার্ডের বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে (ডাইরেক্ট ডেবিটের মাধ্যমে) পরিশোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হওয়া।

৩. নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করার দৃঢ় সংকল্প ও বাস্তব সামর্থ্য থাকা।

৪. কোনো অবস্থাতেই যেন সুদ আরোপিত না হয়, সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।     

৫. ব্যবহারকে প্রকৃত প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং তা যেন বিলাসিতা বা অপ্রয়োজনীয় ভোগের উদ্দেশ্যে না হয়।

সর্বোপরি, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার কেবল অনিবার্য ও বাস্তব প্রয়োজনের ক্ষেত্রেই সীমিত রাখা উচিত। উক্ত ৫টি শর্তে তীব্র প্রয়োজনের সময় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে।

এবার আসি ইসলামি ব্যাংকের কার্ডসমূহের আলোচনায়। ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে যেহেতু শুধুমাত্র নিজের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত টাকাই ব্যবহার করা হয়, তাই ইসলামি ব্যাংকের ডেবিট কার্ড ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই। এখানে ব্যাংক গ্রাহককে কোনো ঋণ প্রদান করে না, বরং গ্রাহক তার নিজস্ব অর্থই উত্তোলন বা ব্যয় করে থাকে। এ কারণে ইসলামি ব্যাংকের ডেবিট কার্ড ব্যবহারকে ইসলামসম্মত বলা যায়। তবে কার্ড ইস্যু, নবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য সেবার বিপরীতে ব্যাংক নির্ধারিত হারে সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করতে পারে। যেহেতু এই চার্জ প্রকৃত সেবা প্রদানের বিনিময়ে নেওয়া হয়, তাই এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে ইসলামি ব্যাংকের ডেবিট কার্ড ব্যবহার এবং এর জন্য নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ প্রদান উভয় ক্ষেত্রেই কোনো সমস্যা নেই।

অন্যদিকে, ক্রেডিট কার্ডের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। বর্তমানে ইসলামি অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের পূর্ণাঙ্গ কোনো ইসলামি বিকল্প এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে অপর একটি অংশের মতে, নির্দিষ্ট কিছু ইসলামসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে ক্রেডিট কার্ডের ইসলামি বিকল্প তৈরি করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন ইসলামি ব্যাংক দুটি ভিন্ন মডেলে তাদের ক্রেডিট কার্ডসদৃশ সেবা চালু করেছে। কিন্তু এসব মডেল বাস্তবে কতটা ইসলামসম্মত ও সুদমুক্ত, সে বিষয়ে আলেম ও গবেষকদের মধ্যে এখনো আলোচনা ও প্রশ্ন বিদ্যমান। তাই ইসলামি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের শরিয়াহ কাঠামো ভালোভাবে যাচাই করা সমীচীন।

বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকগুলো প্রধানত দুটি মডিউলে তাদের ক্রেডিট কার্ড সেবা চালু করেছে। একটি হলো উজরাহ মডিউল এবং অন্যটি হলো মুরাবাহা মডিউল। ইসলামি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের শরয়ি বৈধতা ও কার্যপ্রণালী বোঝার জন্য এই দুটি মডিউল সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।

উজরাহ মডিউলে ব্যাংক গ্রাহককে একটি নির্দিষ্ট সেবা প্রদান করে এবং সেই সেবার বিপরীতে নির্ধারিত ফি বা উজরাহ গ্রহণ করে। এখানে সুদের ভিত্তিতে অর্থ ঋণ দেওয়া হয় না, বরং সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণের নীতি অনুসরণ করা হয়। লক্ষনীয় যে, উক্ত সেবার বিনিময়ে ব্যাংক যে চার্জ নিয়ে থাকে সেটা বাস্তব হতে হবে।

মুরাবাহা মডিউলে ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবা ক্রয় করে নির্ধারিত লাভসহ তার কাছে বিক্রি করে। অর্থাৎ এখানে সম্পর্কটি ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার নয়, বরং বিক্রেতা ও ক্রেতার। ফলে লেনদেনটি সুদের পরিবর্তে ক্রয়-বিক্রয়ভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

তবে কোনো কার্ডকে ইসলামসম্মত বলা হবে কি না, তা শুধু তার নাম বা মডিউলের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর প্রকৃত চুক্তিপত্র, ব্যবহারবিধি, বিল পরিশোধে বিলম্বের শর্ত, জরিমানা ব্যবস্থা এবং শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাই ইসলামি ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কার্ড সম্পর্কে চূড়ান্ত শরয়ি মতামত দেওয়ার আগে তার বিস্তারিত শর্তাবলি ও কাঠামো যাচাই করা জরুরি।

(সহিহ মুসলিম ১৫৯৮, ১৫৯৯, তাফসিরে কুরতুবি ৩/২২৫, তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ১/৬১৯, আল-মুহিতুল বুরহানি ৮/৭৩, ফিকহুল বুয়ু ৪৬৩)