আব্বাস ইবনে ফিরনাস। জন্ম ৮১০ খ্রিস্টাব্দে, মুসলিম জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র স্পেনে। একাধারে তিনি ছিলেন প্রকৌশলী, উদ্ভাবক, উড্ডয়ন বিশারদ, চিকিৎসক, কবি, সুরকার, পদার্থবিদ, সংগীতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তার জন্মস্থান ছিল স্পেনের রোনদায়, যা এখন স্পেনের অন্যতম পর্যটন শহর। আধুনিক বিমান আবিষ্কারের প্রায় হাজার বছর আগে তিনি আকাশে উড়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। তাই তাকে বিমানের জনক বলেও আখ্যায়িত করা হয়।
বিশ্বের প্রথম সফল ও নিয়ন্ত্রিত বিমান আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় উইলবার রাইট ও অরভিল রাইটকে। তাই সাধারণ অর্থে তাদেরকেই বিমানের জনক বলা হয়। তবে আধুনিক ইঞ্জিনচালিত বিমানের জনক হিসেবে তাদের নাম নেওয়া হলেও আকাশে ওড়ার বৈজ্ঞানিক স্বপ্ন ও সাহসিকতার প্রথম পথপ্রদর্শক ছিলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তার এই অসামান্য কীর্তির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাকেও বিমানের জনক বলা হয়ে থাকে।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস সম্পর্কে ১৭ শতাব্দীর বিখ্যাত আলজেরীয় ঐতিহাসিক আল-মাকারির লেখায় তার ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়। এছাড়াও আব্বাস ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রসঙ্গে মন্তব্য পাওয়া যায় সমসাময়িক কর্ডোভার আমির, প্রথম মুহাম্মদের রাজকবি মুমিন ইবনে সাঈদের কবিতায়। মুমিন ইবনে সাঈদ ফিরনাস সম্পর্কে কবিতায় লিখেন, ‘শকুনের পালক দ্বারা আবৃত হলে তিনি ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুত ওড়েন।’
আব্বাস ইবনে ফিরনাস তার উদ্ভাবিত উড্ডয়ন যন্ত্রে পালক ও সিল্কের ব্যবহার করেছিলেন। ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে তিনি স্পেনের কর্ডোভার নিকটবর্তী রুসাফা এলাকার আরুস পর্বত থেকে তার উদ্ভাবিত উড্ডয়নযন্ত্র সহকারে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কর্ডোভা থেকে অনেক মানুষ তার আকাশে ওড়া দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, এখান থেকে ওড়ার পর যদি সব ঠিক থাকে তবে আমি এখানেই আবার ফিরে আসব। তার উড্ডয়নযন্ত্র সফলভাবেই কাজ করে এবং প্রায় ১০ মিনিট তিনি তার যন্ত্রের সাহায্যে উড়তে সমর্থ হন। কিন্তু সফলভাবে উড়লেও তিনি একটু ভুল করেছিলেন।
আল-মাকারি উল্লেখ করেন, তিনি তার শরীরকে পালক দ্বারা আবৃত করেন এবং তার শরীরে কয়েকটি পাখা যোগ করেন। তারপর শূন্যে ভেসে পড়েন। যারা তার এই উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের লেখনীতে পাওয়া যায়, তিনি পাখার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দূরত্ব অতিক্রম করেন এবং যেখান থেকে উড্ডয়ন শুরু করেছিলেন আবার সেখানে ফিরে আসেন। কিন্তু সফলভাবে অবতরণ করতে ব্যর্থ হন। এ সময় তিনি গুরুতর আহত হন।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস প্রাণে বেঁচে গেলেও পিঠে গুরুতর আঘাত পান। তার বয়স তখন পঁয়ষট্টি বছর। এরপর তিনি তার উড্ডয়নযন্ত্রে ঠিক কী ভুল ছিল তা শনাক্তকরণে মনোনিবেশ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, পাখি অবতরণের সময় লেজ এবং ডানাগুলোর সমন্বিতভাবে কার্যকারিতার মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু তিনি তার যন্ত্রে গতি কমানোর জন্য সে রকম কোনো লেজ বা বিকল্প পদ্ধতি রাখেননি। তারপরও তিনি প্রায় ১২ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তার পক্ষে আর আকাশে ওড়া সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি আর আগের মতো সুস্থতা লাভ করেননি। ৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে আব্বাস ইবনে ফিরনাস ইন্তেকাল করেন। আকাশে ওড়ার পেছনে মানুষের যে প্রচেষ্টা সেটার একজন সফল স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তার প্রচেষ্টাকে বলা যায় আধুনিক উড়োজাহাজ আবিষ্কারের প্রথম ধাপ। মানুষকে ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন দেখানো আব্বাস ইবনে ফিরনাস তাই ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
এর আগে তিনি ৮৫২ খ্রিস্টাব্দে কর্ডোবার গ্র্যান্ড মসজিদের মিনার থেকে একটি ক্যানভাস ছাতার মতো কাপড়ের সাহায্যে নিচে লাফিয়ে পড়েন। এটি ইতিহাসে আধুনিক প্যারাসুটের প্রথম আদি রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা তার পতনের গতি ধীর করে দিয়েছিল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আব্বাস ইবনে ফিরনাসের তুমুল আগ্রহ তাকে পানিচালিত ঘড়ি আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায়। এছাড়াও তিনি বালু ও কোয়ার্টজ স্ফটিকের বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য সেগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। অনেক ঐতিহাসিক এই দুটি উপকরণের মাধ্যমে স্বচ্ছ গ্লাস আবিষ্কারের কৃতিত্ব তাকেই দিয়ে থাকেন। এমনকি বিখ্যাত আন্দালুসিয়ান গ্লাসের জনকও তিনি, যা এখনো মানুষ ব্যবহার করে এবং এখনো এর তুমুল চাহিদা পরিলক্ষিত হয়। ভিজুয়াল চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রেও তার এই উদ্ভাবন বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। যেহেতু লেন্স, যা ক্ষুদ্র বস্তু দেখতে ও ক্ষুদ্র লেখা পড়তে আমাদের সাহায্য করে, তা আবিষ্কারের কৃতিত্বও তাকে দেওয়া হয়।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস ব্রিজ। ২০১১ সালে স্পেনের কর্ডোভা শহরে গুয়াদালকুইভির নদীর ওপর এই সেতুটি নির্মিত হয়, যা তার স্মৃতি বহন করছে। ১৯৭৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন চাঁদের একটি ক্রেটারের নাম ‘ইবনে ফিরনাস’ রাখে। ফিরনাস এয়ারওয়েজ একটি ব্রিটিশ ওয়ান-প্লেন এয়ারলাইন, যা তার নামে নামকরণ করা হয়েছে।