স্ত্রীর প্রতি আচরণ যেমন হওয়া উচিত

দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ হলেও তা সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখা সবসময় সহজ হয় না। একটি সুখী সংসার গড়তে ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়। অনেক সময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিজের কিছু অভিমান ও রাগ সংযত করতে হয়। একজন স্বামীর উচিত কৌশলী, দায়িত্বশীল ও স্নেহশীল অভিভাবকের মতো আচরণ করা।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া ও মানসিক মিল না থাকলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কখনো কখনো তা বিচ্ছেদের মতো চরম পরিণতির দিকেও গড়াতে পারে। অথচ কিছু সহজ ও বাস্তব বিষয় নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা ও পারস্পরিক বিশ্বাস অনেক গভীর হয়।

স্ত্রী আপনার জীবনসঙ্গিনী। তাই তার ভুল হলে তাকে অপমান নয়, ভালোবাসা দিয়ে সংশোধন করুন। তাকে এমন অনুভব করান যে, পৃথিবীতে আপনিই তার সবচেয়ে আপন মানুষ। স্ত্রীর সঙ্গে যেসব আচরণ বেশি করবেন এবং যেসব আচরণ কখনো করবেন না, সেই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

পরিপাটি থাকা : স্ত্রীর সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে থাকুন। তিনি যেভাবে আপনাকে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকার চেষ্টা করুন। কখনো অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় তার সামনে যাবেন না। রাসুল (সা.) বলেন, আমি আমার স্ত্রীদের জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তাদের কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি। (বায়হাকি ১৪৭২৮)

সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা : সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রী ও পরিবারের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করুন। সব সময় সম্ভব না হলেও মাঝে মাঝে বিশেষ আয়োজন করুন। এ ক্ষেত্রে কৃপণতা করবেন না। রাসুল (সা.) বলেন, সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়। (সহিহ বুখারি ৫৩৫১)

ঘরের কাজে সহযোগিতা করা : ব্যস্ততা থাকলেও সুযোগ পেলেই ঘরের কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করুন। কোনো কারণে না পারলে সুন্দরভাবে কারণ বুঝিয়ে বলুন।

স্ত্রীর প্রশংসা করা : স্ত্রীর ছোট ছোট ভালো কাজেরও আন্তরিক প্রশংসা করুন। প্রশংসা ভালোবাসা বাড়ায় এবং হৃদ্যতা গভীর করে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) প্রায়ই হযরত খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন। (সহিহ বুখারি ৫২২৯)

প্রহার না করা : দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ হতেই পারে। প্রয়োজনে কিছু সময় দূরে থাকুন। বিছানা আলাদা করুন। কিন্তু কখনোই স্ত্রীর গায়ে হাত তুলবেন না। এমনটা করলে সে তা চিরদিন মনে রাখবে। রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করে। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে। (সহিহ বুখারি ৫২০৪)

খোলামেলা কথা বলা : প্রতিদিন কিছু সময় একে অপরের সঙ্গে মন খুলে কথা বলুন। পরস্পরের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। অপ্রয়োজনীয় গোপনীয়তা ও সন্দেহ সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।

সময় দেওয়া : প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শুধু স্ত্রীর জন্য রাখুন। একসঙ্গে খাওয়া, হাঁটা বা কিছুক্ষণ গল্প করা। এসব বিষয় সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। অযথা মোবাইলে সময় নষ্ট না করে পরিবারকে সময় দিন। দূরে থাকলে দীর্ঘ সময় তার সঙ্গে ফোনে কথা বলুন।

নতুন দাম্পত্যে একাকিত্ব এড়িয়ে চলা : সন্তান হওয়ার আগে যতটা সম্ভব স্ত্রীকে একা না রেখে নিজের সান্নিধ্যে রাখুন। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে তার মানসিক সমর্থন প্রয়োজন।

বাবার বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া : প্রয়োজনে সময়ে সময়ে তাকে তার বাবা-মায়ের কাছে যেতে দিন। এতে তার মানসিক প্রশান্তি বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় মনোমালিন্যও কমবে।

রাগ নিয়ন্ত্রণ করা : রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। সমস্যা হলে শান্তভাবে আলোচনা করুন। অনেক সময় মুহূর্তের রাগ সারা জীবনের অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঘুরতে যাওয়া : সুযোগ হলে মাসে অন্তত একদিন একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যান। ব্যস্ততার বাইরে কাটানো কিছু সময় সম্পর্ককে সতেজ রাখে।

ভালোবাসা প্রকাশ করা : মাঝে মাঝে তাকে উপহার দিন। ভালোবাসার কথা বলুন। ছোট ছোট চমক দিন। এসব বিষয় সম্পর্ককে প্রাণবন্ত ও মধুর রাখে।

অপমান না করা : কখনো তাকে খারাপ নামে ডাকবেন না। অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করবেন না এবং তার বাবা-মাকে নিয়ে কটূক্তি করবেন না। যৌতুক দাবি করা বা সেটার ইঙ্গিত দেওয়াও সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।

অন্যের সঙ্গে তুলনা না করা : স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না। তাকে অনুভব করান, তিনি আপনার কাছে সম্মানিত, প্রিয় ও অনন্য।

দোষ না খোঁজা : তার ভুল সবার সামনে প্রকাশ করবেন না। ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করুন। কোনো ভুল হয়ে গেলে তা নিয়ে বারবার তাকে কষ্ট দেবেন না। ক্ষমা করতে শিখুন এবং সামনে এগিয়ে চলুন।

মনে রাখবেন, সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, ক্ষমাশীলতা ও আল্লাহভীতির ওপর। অভিমান, রাগ, অহংকার ও অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া থেকে দূরে থেকে একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়ার চেষ্টা করুন। সুন্দর সংসার হঠাৎ তৈরি হয় না, এটি প্রতিদিনের সুন্দর আচরণ, ত্যাগ ও আন্তরিকতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভালোবাসা, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরপুর সুখী দাম্পত্য জীবন দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা