দক্ষ যুবসমাজ গড়তে ইসলামের নির্দেশনা

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ এএম

মানুষের জীবনে জ্ঞান অপরিহার্য। দক্ষতাও অপরিহার্য। কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করলেই একজন মানুষ সমাজে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। তার অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা, কর্মদক্ষতা, সৃজনশীলতা, সততা এবং সমস্যা সমাধান করার যোগ্যতাই তাকে প্রকৃত অর্থে সফল করে তোলে। ইসলামও এমন মানুষ গড়ে তুলতে চায়, যারা কর্মদক্ষ, দায়িত্বশীল, উৎপাদনশীল এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত হবে।

ইসলামে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সেই জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ পছন্দ করেন যে, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, তখন সে যেন তা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে।’ (মুসনাদ আবু ইয়ালা ৪৩৮৬) এই হাদিসে উৎকর্ষ, পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতার প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাজ যাই হোক, তা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করাই একজন মুসলমানের পরিচয়।

ইসলামের ইতিহাসে দক্ষতার অসংখ্য অনন্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম ছিলেন দক্ষ লৌহশিল্পী। মহান আল্লাহ তাকে লোহা নরম করে বর্ম তৈরির বিশেষ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন। হজরত নুহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশনায় জাহাজ নির্মাণ করেছিলেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতাও মহান আল্লাহর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত।

ইসলামে জীবিকা অর্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যদি তা হালাল উপায়ে হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেউ কখনো নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য ভক্ষণ করে না।’ (সহিহ বুখারি ২০৭২) এই শিক্ষা মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। ভিক্ষাবৃত্তি বা অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে জীবিকা অর্জন করাই ইসলামের আদর্শ।

বর্তমান সময়ে তরুণদের সামনে যেমন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি নানা চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা, গবেষণা, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা সৃজনশীল বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট, উদ্দেশ্যহীন বিনোদন এবং অনলাইন আসক্তি অনেক তরুণের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

ইসলাম সময়ের যথাযথ ব্যবহারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামত সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা হলো সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি ৬৪১২) তাই অবসর সময়কে দক্ষতা অর্জন ও আত্মউন্নয়নের কাজে ব্যয় করাই একজন সচেতন মুসলমানের কর্তব্য।

দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ কিন্তু অসৎ ব্যক্তি সমাজের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই ইসলাম এমন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে চায়, যারা আমানতদার, সত্যবাদী ও দায়িত্বশীল। পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।’ (সুরা কাসাস ২৬) এখানে শক্তিশালী বলতে শারীরিক শক্তির সঙ্গে যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতাকেও বোঝানো হয়েছে। আর বিশ্বস্ততা হলো সেই দক্ষতার নৈতিক ভিত্তি।

পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে তরুণদের প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করার বিষয়ে। প্রত্যেক মানুষের সক্ষমতা একরকম নয়। কেউ লেখালেখিতে দক্ষ, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ ব্যবসায়, কেউ গবেষণায়, আবার কেউ কারিগরি কাজে পারদর্শী। ইসলাম প্রতিটি হালাল দক্ষতাকে সম্মান করে এবং মানবকল্যাণে তা কাজে লাগাতে উৎসাহিত করে।

একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, নিজের দক্ষতার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রাখা। যে সমাজে দক্ষ, সৎ ও কর্মঠ মানুষের সংখ্যা বেশি, সেই সমাজ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, বেকারত্ব কমে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হয়।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত