ভারী বৃষ্টিতে পানির নীচে ফসলের মাঠ, আমনের বীজতলা নিয়ে শঙ্কায় কৃষক

টানা এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে পটুয়াখালীর দুমকিসহ জেলার উপকূলীয় এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত। পানি কিছুটা নামতে শুরু করলেও বীজতলা ও সবজি রক্ষা করা যাবে কি না, সে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে হাজারো কৃষকের।

উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের আঠারগাছিয়া গ্রামের কৃষক খলিল সিকদার জানান, গত একসপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে আমনের বীজতলা নস্ট হয়ে গেছে। একই অভিযোগ শ্রীরামপুর ইউনিয়নের রাজাখালীর বাসিন্দা আ: মজিদ হাওলাদার, কবির হাওলাদার, হাবিবুর রহমান মৃধাসহ অনেকের। তবে দক্ষিন উপকূলের অবস্থা আরও ভয়াবহ।

গলাচিপা উপজেলার চর কাজল ইউনিয়নের কৃষক মো. হানিফ চৌকিদার এবার ১৩ একর জমিতে আমন চাষের প্রস্তুতি নিয়েছেন। এজন্য তিনি প্রায় ২২ হাজার টাকা দিয়ে চার মণ বীজধান কিনে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। জমি প্রস্তুত ও বীজতলা তৈরিতে অতিরিক্ত খরচও হয়েছে। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পুরো বীজতলাই পানির নিচে তলিয়ে যায়।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও বীজতলা বাঁচবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। হানিফ চৌকিদার বলেন, মৌসুমের শুরুতেই এত বড় ক্ষতির মুখে পড়ব, তা ভাবিনি। বীজতলা নষ্ট হলে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।

একই উপজেলার আরেক কৃষক এছিন মৃধাও পাঁচ একর জমিতে আমন চাষের জন্য প্রায় ১১ হাজার টাকার বীজ কিনে বীজতলা করেছিলেন। অতিবৃষ্টির কারণে তার বীজতলাও দীর্ঘ সময় পানির নিচে ছিল। তিনি বলেন, বীজতলার অবস্থা খুব খারাপ। নতুন করে বীজতলা করতে হলে খরচও বাড়বে, সময়ও নষ্ট হবে। শুধু আমনের বীজতলাই নয়, গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষিরাও একই ধরনের সংকটে পড়েছেন।

রাঙ্গাবালী উপজেলার চর গঙ্গা এলাকার কৃষক রাসেল হাওলাদার পাঁচ শতাংশ জমিতে পুঁইশাক, ঢেঁড়স, বরবটি, পেঁপে ও লালশাকের আবাদ করেছিলেন। এতে তার ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে সাত হাজার টাকার সবজি বিক্রি করলেও মাঠে থাকা বাকি সবজির সম্ভাব্য বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পুরো ক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে।

রাসেল হাওলাদার বলেন, পেঁপে ছাড়া অন্য কোনো সবজি বাঁচানো যাবে কি না বুঝতে পারছি না।

একই উপজেলার দক্ষিণ বাহেরচর গ্রামের কৃষক সুপন মাহমুদ ১০ শতাংশ জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছিলেন। এতে তার ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু মাত্র দেড় হাজার টাকার সবজি বিক্রি করার পরই বৃষ্টির পানিতে পুরো ক্ষেত তলিয়ে যায়। তিনি বলেন, এখন কীভাবে ফসল বাঁচাব, সেটাই বুঝতে পারছি না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১২ জুলাই পযন্ত পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় মোট ৪৪৮ দশমিক ৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময়ে জেলার নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

এর ফলে জেলায় প্রায় ২ হাজার ৮০৫ হেক্টর ফসলি জমি বৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ধানের ৫২০ হেক্টর, আমনের বীজতলার ৯৭০ হেক্টর, শাকসবজির ৮৫০ হেক্টর, পানের ১২০ হেক্টর, কলার ৮০ হেক্টর, অন্যান্য সাম্মান ফসলের ৪০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন তরমুজের ৪ হেক্টর, পেঁপের ২২০ হেক্টর এবং মরিচের দশমিক ৫ হেক্টর ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় এক লাখ ৮৯ হাজার ৮৩৮ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৩ হাজার ৮০১ হেক্টর বীজতলা।

কৃষি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, পানিতে ডুবে থাকা বীজতলার চারা নষ্ট হলে অনেক কৃষককে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে। এতে আমন চাষের সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সবজির উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ কমে দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে জেলার নিচু এলাকার অনেক কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। তবে এখনো প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যায়নি। পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করে ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।