ফুলগাজীতে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা, ভোগান্তিতে সেবাগ্রহীতা

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার অধিকাংশ সরকারি দপ্তরে পূর্ণকালীন কর্মকর্তা না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সরকারি সেবাদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বর্তমানে পূর্ণকালীন কর্মকর্তা নেই। 

গত ২৩ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহরিয়া ইসলামকে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। তিনি গত ৮ জুলাই ফুলগাজী থেকে বিদায় নেন। এরপর থেকে পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতনু বড়ুয়াকে ফুলগাজীর ইউএনওর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ইতোমধ্যে এ পদে নতুন একজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে এবং তিনি খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি উপজেলা থেকে শিগগিরই ফুলগাজীতে যোগদান করবেন।

এদিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সোহেলী নোশিন প্রত্যাশা প্রশিক্ষণে থাকায় ভূমি অফিসের নিয়মিত কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় পরশুরাম উপজেলার পিআইও রাজিব আহমেদ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। দুর্যোগপ্রবণ এ উপজেলায় পূর্ণকালীন পিআইও না থাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ জুলাই ফুলগাজী উপজেলা প্রকৌশলী সৈয়দ আসিফ মুহাম্মদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় বদলি হন। দায়িত্ব হস্তান্তরের পর বর্তমানে ফেনী এলজিইডির সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী আসিফ আহনাফ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

এছাড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদেও দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণকালীন কর্মকর্তা না থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে প্রায়ই শুনতে হয়—‘স্যার নেই’ বা ‘অন্য উপজেলা থেকে আসবেন’। এতে নামজারি, উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইল নিষ্পত্তি, শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।

ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা সাইফুল ইসলাম বলেন, এসিল্যান্ড না থাকায় আমার নামজারির কাজ ঝুলে আছে। কয়েকবার অফিসে এসেও কোনো সমাধান পাইনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ সময়মতো সম্পন্ন হচ্ছে না।

এ বিষয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদে ইতোমধ্যে একজন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে। তিনি শিগগিরই যোগদান করবেন। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ এ উপজেলায় পূর্ণকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্যান্য শূন্য পদেও দ্রুত কর্মকর্তা পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন না হওয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা। বর্তমানে ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. খোরশেদ আলম, দরবারপুর ইউনিয়নে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মাসুদুল হক, আনন্দপুর ইউনিয়নে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ তারেক মাহমুদ, জিএমহাট ইউনিয়নে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং আমজাদহাট ইউনিয়নে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. মুরাদ হোসেন দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দুর্যোগপ্রবণ ও সীমান্তবর্তী উপজেলা হিসেবে ফুলগাজীতে দ্রুত সব শূন্য পদে পূর্ণকালীন কর্মকর্তা পদায়ন করা না হলে প্রশাসনিক সেবার মান আরও ব্যাহত হবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।