'মেসিকে আটকানো অসম্ভব, শুধু ম্যাচটা কঠিন করা সম্ভব'—আতঙ্কে ইংল্যান্ড

ইতিহাসের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি তাঁর ক্যারিয়ারে অসংখ্য গৌরবময় মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু ফুটবলীয় ভাগ্যের এক অদ্ভুত পরিহাসে, দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে আন্তর্জাতিক মঞ্চে থ্রি লায়ন্স বা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি কখনো হননি তিনি। আজ দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অবশেষে অবসান ঘটছে সেই অপেক্ষার। জীবনের প্রথমবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে মেসির মাথায় আসলে কী চলছে? ৩৯ বছরের এক 'জিনিয়াস' কীভাবে ডিফেন্ডারদের মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে ফেলেন, তা নিয়েই বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। 

আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই যেখানে ফকল্যান্ডস যুদ্ধ, ম্যারাডোনার বিতর্কিত গোল এবং ঐতিহাসিক বৈরিতার এক অগ্নিকুণ্ড—সেখানে লিওনেল মেসির কাছে এটি স্রেফ আরেকটি সাধারণ ফুটবল ম্যাচ।

এমনকি ১৯৯৮ সালের সেই ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনালের কথা জিজ্ঞেস করা হলে, তৎকালীন ১১ বছর বয়সী মেসির সহজ সরল উত্তর ছিল: "আমার মনে আছে ফ্যামিলির সাথে ম্যাচটা দেখেছিলাম। খেলা শেষ হতেই আমরা রাস্তায় ফুটবল খেলতে দৌড়ে গিয়েছিলাম।"

এই যে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে ফুটবলকে স্রেফ খেলা হিসেবে দেখার মানসিকতা, এটিই ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ। মেসির খুব কাছের মানুষেরা বলেন, "ও বুধবার রাতে সিনসিনাটির বিপক্ষে যেভাবে খেলে, ব্রাজিলের বিপক্ষেও ঠিক একই মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে।" তাঁর কাছে প্রতিপক্ষ কে, তা বড় বিষয় নয়; তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে ট্রফি ধরে রাখা।

মেসির বয়স এখন ৩৯। স্বভাবতই ২০ বা ২৫ বছর বয়সের সেই অতিমানবীয় গতি বা ড্রিবলিং এখন আর নেই। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে তীক্ষ্ণ হয়েছে তাঁর ফুটবলীয় বুদ্ধি। বিশ্বের বড় বড় ডিফেন্ডারদের মতে, মেসির খেলার ধরণ দেখলে মনে হয় তিনি আগে থেকেই জানেন বল কোথায় যাবে!

  • ম্যাচের শুরুতে অলস হেঁটে বেড়ানোর রহস্য: ম্যাচের শুরুর ১০-১৫ মিনিট মেসিকে মাঠে নিষ্ক্রিয়ভাবে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায়। সাধারণ দর্শক এটিকে আলসেমি মনে করলেও, বিজ্ঞান ও ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। এই সময়ে মেসির মস্তিস্ক মূলত প্রতিপক্ষের পুরো ট্যাকটিক্যাল ম্যাপ তৈরি করে। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স কীভাবে নড়ছে, ডিফেন্ডারদের মাঝে ফাঁকা জায়গা কোথায় তৈরি হচ্ছে, কোন ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করা সবচেয়ে সহজ—মেসি অলস হেঁটে হেঁটে এই পুরো ডেটা নিজের মাথায় প্রসেস করেন।

  • মিসর ম্যাচের উদাহরণ: শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ৭৩ মিনিট পর্যন্ত মেসিকে মাঠে খুঁজে পাওয়া যায়নি, এমনকি পেনাল্টিও মিস করেছিলেন। কিন্তু ঠিক ৭৩ মিনিটে তিনি খেলা বদলে দেন। হুট করেই উইং দিয়ে ভেতরে ঢুকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে দিয়ে গোল করান এবং নিজে গোল করে সমতা ফেরান।

এ কারণেই ইংল্যান্ডের হেড কোচ থমাস টুখেল ভালো করেই জানেন, মাঠে মেসি যখন কিছুই করছেন না, তখনই আসলে তিনি প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় ফাঁদ পাতছেন।

মেসিকে আটকানোর উপায় কী? 

২০১৪-১৫ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে মেসির সেই বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের পর চেলসির তৎকালীন কোচ হোসে মরিনহো মেসিকে আটকানোর একটি দুর্দান্ত কৌশল ব্যাখ্যা করেছিলেন, "আমি কখনোই মেসিকে সম্পূর্ণ 'থামিয়ে দেওয়ার' কথা ভাবি না। সেটি অসম্ভব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দলগতভাবে ওকে মাঠে একটি 'কঠিন ম্যাচ' উপহার দেওয়া, যেন ও সহজে নিজের কাজটা করতে না পারে। মেসির বিরুদ্ধে এটাই সেরা কৌশল।"

আজকের ম্যাচে ইংল্যান্ড দলে জুড বেলিংহামের মতো তরুণ তুর্কি থাকলেও, টুখেলের দলে কোনো 'লিওনেল মেসি' নেই। তবে ৩৯ বছরের মেসির একমাত্র দুর্বল জায়গা হতে পারে পেনাল্টি। বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত ৮টি পেনাল্টির ৪টিই তিনি মিস করেছেন (৫০% মিস রেট)। ম্যাচ যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তবেই হয়তো ইংল্যান্ডের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি এসবে কান দিতে নারাজ। তাঁর সহজ কথা, "মেসিকে মাঠে নিজের মতো করে খেলতে দাও। ও যা চায়, তাই করুক।"