আটলান্টায় ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার হাইভোল্টেজ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে মাঠের বাইরের রাজনৈতিক উত্তেজনা চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল ইংলিশদের সরাসরি ‘দখলদার জলদস্যু’ এবং ‘আক্রমণকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বৈরিতার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছেন।
আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টার এই ব্লকবাস্টার ম্যাচের বিজয়ী দল ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেনের। তবে ফুটবলীয় লড়াই ছাপিয়ে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের (আর্জেন্টিনায় যা 'আইসল্যান্ড মালভিনাস' নামে পরিচিত) যুদ্ধ এবং ঐতিহাসিক ভূ-রাজনীতিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল কোনো প্রকার কূটনৈতিক সৌজন্যতা বজায় না রেখেই তীব্র আক্রমণাত্মক বার্তা দেন। তিনি লেখেন, "আগামীকাল আমরা দখলদার জলদস্যুদের বিরুদ্ধে খেলব। এটি কেবল আরেকটি সাধারণ ম্যাচ নয়। আমি কোনো রাজনৈতিকভাবে সঠিক বা কোল্ড-হার্টেড আচরণ করতে যাচ্ছি না; ইংলিশদের বিরুদ্ধে ম্যাচ সবসময়ই বিশেষ কিছু। এটি মালভিনাসের লড়াই, এটি ডিয়েগোর লড়াই, এটি লিও-র (মেসি) শেষ বিশ্বকাপ লড়াই এবং এটি আক্রমণকারীদের থামিয়ে দেওয়ার মঞ্চ। এগিয়ে যাও আর্জেন্টিনা! কারণ আমাদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমরা আমাদের নিজেদের জিনিস দাবি করে যাব!"
ফুটবলের মাঠে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন কিছু নয়। ১৯৬৬ সালের বিতর্কিত ম্যাচ, ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় 'হ্যান্ড অব গড' ও শতাব্দীর সেরা গোল, ১৯৯৮ সালের ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ডের নাটকীয়তা এবং ২০০২ সালের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের মাধ্যমে এই বৈরিতা কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে।
তবে খেলার বাইরের দ্বন্দ্বটি আরও গভীর। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশ সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়, যা ব্রিটেনের জয়ের মাধ্যমে শেষ হয় এবং দ্বীপটি ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থেকে যায়। আর্জেন্টিনা আজও এই দ্বীপের ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে। ২০১৩ সালের এক গণভোটে দ্বীপের ৯৯%-এর বেশি বাসিন্দা ব্রিটিশ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দিলেও আর্জেন্টিনা তা স্বীকার করে না। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই তাদের কাছে শেষ কথা।
রাজনীতিকরা যখন যুদ্ধংদেহী মনোভাব তৈরি করছেন, তখন ফুটবলার ও কোচরা মাঠের মনোযোগ ধরে রাখতে শান্ত থাকার চেষ্টা করছেন। আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে বলেন:
"আমাদের বার্তা খুব পরিষ্কার—এটি একটি ফুটবল ম্যাচ। আমি শুধু এটাই বলতে পারি। আমরা অত্যন্ত কঠিন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছি, যাদের একজন চমৎকার কোচ রয়েছেন। এটি স্রেফ একটি ফুটবল খেলা এবং এর বাইরে কিছু নয়।"
দলের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার লিয়েন্দ্রো পারেদেসও কোচের সুরেই কথা বলেছেন, "আমরা জানি আমাদের দেশের মানুষের কাছে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচের গুরুত্ব কতটা। তবে দিনশেষে এটি একটি ফুটবল ম্যাচ এবং আমরা আমাদের সেরা খেলাটা খেলার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।"
এদিকে ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেন ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ। আইটিভি -কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "আমার মনে হয় মাঠের বাইরের ইতিহাস নিয়ে খেলোয়াড়দের খুব বেশি ভাবা উচিত নয়। এগুলো সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বিষয়। খেলোয়াড়দের দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা কেবল একটি দুর্দান্ত, স্মার্ট ও কৌশলী দলের বিরুদ্ধে মাঠে নামছি, যারা ফাউল আদায় করতে এবং খেলার গতি মন্থর করে দিতে ওস্তাদ।"
মাঠের বাইরে রাজনৈতিক পারদ যত উঁচুর দিকেই যাক না কেন, আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মেসি বনাম হ্যারি কেনের ফুটবলীয় লড়াইয়ে কে শেষ হাসি হাসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।