আটলান্টার সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এই মহারণের জয়ী দলই আগামী রবিবার ফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেনের। আর মাঠের এই হাইভোল্টেজ লড়াই গ্যালারিতে বসে দেখছেন ডেভিড বেকহ্যাম, যার কাছে এই ম্যাচটি কেবল একটি সেমিফাইনাল নয়—বরং নিজের জীবনের এমন কিছু ক্ষতকে পুনরুজ্জীবিত করা, যা শুকাতে লেগেছিল বছরের পর বছর।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একদিকে বেকহ্যামের আজন্ম লালিত দেশপ্রেম, অন্যদিকে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা—যার জন্য বেকহ্যামকে করতে হয়েছিল জীবনের দীর্ঘতম অপেক্ষা।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ফুটবলীয় দ্বৈরথের ইতিহাসে ডেভিড বেকহ্যামের নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে। ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন, ফ্রান্সের মার্সেইতে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র ম্যাচে আর্জেন্টিনার তৎকালীন মিডফিল্ডার ডিয়েগো সিমিওনেকে শুয়ে থাকা অবস্থায় বোকার মতো লাথি মেরে বসেন ২৩ বছরের তরুণ বেকহ্যাম। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে, আর টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় ইংল্যান্ড।
পরদিন থেকে রাতারাতি ব্রিটেনের ‘পোস্টার বয়’ থেকে ‘জাতীয় শত্রু’-তে পরিণত হন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের তৎকালীন এই নাম্বার সেভেন। বেকহ্যাম সেই দুঃসহ স্মৃতির রোমন্থন করে তিনি বলেন, "আমি একটা ছোট্ট ভুল করেছিলাম যা আমার পুরো জীবনটা বদলে দিয়েছিল। নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ আর অরক্ষিত লাগছিল। পুরো দেশ আমাকে ঘৃণা করত। সত্যি সত্যিই তীব্র ঘৃণা করত।"
সেই সময় ওল্ড ট্রাফোর্ড বাদে ইংল্যান্ডের প্রতিটা স্টেডিয়ামে পা রাখলেই বেকহ্যামকে দুয়োধ্বনি শুনতে হতো। এমনকি কর্নার বা ফ্রি-কিক নিতে গেলে প্রতিপক্ষের সমর্থকরা তার গায়ে থুতু পর্যন্ত ছিটাত।
ঐতিহাসিক এই ক্ষতের প্রতিশোধ নিতে বেকহ্যামের সময় লেগেছিল দীর্ঘ চার বছর। ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বেই মুখোমুখি হয় এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। এবারও ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ও ৭ নম্বর জার্সির মালিক ছিলেন বেকহ্যাম। ম্যাচের ৪৪ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ১৯৯৮-এর প্রতিশোধ নেন তিনি। মার্সেলো বিয়েলসার শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল সেই হারের খেসারত দিয়ে।
২০০৭ সালে যখন বেকহ্যাম যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার -এ খেলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভবিষ্যতে মাত্র ২৫ মিলিয়ন ডলারে একটি নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনার অধিকার পান তিনি। সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নেয় 'ইন্টার মায়ামি'। কিন্তু দলটিকে বিশ্বম্যাপে তুলতে তার প্রয়োজন ছিল সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে।
মেসিকে মায়ামিতে সই করানোর পেছনের গল্পটি মনে করে বেকহ্যাম বলেন, "আমরা লিও-র বাবার সাথে অনেকদিন ধরে কথা বলছিলাম। লিও সই করার ঠিক পাঁচ বছর আগে আমার এক পার্টনার লুকিয়ে ওর বাবার সাথে দেখা করতে একটা হোটেলে যায়। আমি তখন তাকে বলেছিলাম, 'দেখুন, আমি জানি লিও এখন প্রস্তুত নয়, তবে ভবিষ্যতে আমি ওকে আমার ক্লাবে দেখতে চাই'।"
অবশেষে ২০২৩ সালের ৭ জুন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। জাপানের একটি হোটেলে ঘুমের ঘোরে থাকা বেকহ্যামের ফোন যখন অনবরত কেঁপে উঠছিল, তখন তিনি জানতে পারেন মেসি ইন্টার মায়ামিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিন বছর ধরে ইন্টার মায়ামিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাবে পরিণত করেছেন মেসি। তবে আজ রাতে ইতিহাসের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ডেভিড বেকহ্যাম। যে মেসিকে পাওয়ার জন্য ৫ বছরের দীর্ঘ মিশন চালিয়েছেন, আজ কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও সেই মেসির দেশের বিপক্ষেই থাকবে বেকহ্যামের হৃদয়।
মেসি যেখানে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে মরিয়া, বেকহ্যাম তখন গ্যালারিতে বসে প্রার্থনা করবেন যাতে ১৯৬৬ সালের পর তার প্রাণের ইংল্যান্ড প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখতে পারে।