ইরানের নজরে ‘বাব আল-মান্দেব’

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস ও সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে দেশটিতে যৌথভাবে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। তবে তাদের সে লক্ষ্য পূরণ একদিকে যেমন দূরের বাতিঘর হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে সাম্প্রতিক এই যুদ্ধ ইরানের হাতে তুলে দিয়েছে নতুন এক অস্ত্রহরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান বিশ্ব বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ-পথটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দেয়; তেলের দাম বেড়ে যায় হু হু করে। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে হরমুজকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বাধাগ্রস্ত করার পর এবার লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ওয়াশিংটনকে চাপ প্রয়োগের নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান। গতকাল বুধবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির সুবিধা হয় সবাই পাবে, না হয় কেউই পাবে না। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের মাধ্যমে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের চেষ্টা হলে ওয়াশিংটনের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি পরিবহনপথই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সংকীর্ণ এই প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ এ পথ দিয়েই সম্পন্ন হয়। ইরানের প্রেস টিভির খবরে বলা হয়, গত সোমবার হুতিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হামলা চালিয়ে যায়, তবে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে প্রস্তুত আছেন। তার দাবি, এমনটি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। হুতি-সংশ্লিষ্ট আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ইয়েমেনে হামলার জন্য উসকানি দিচ্ছে, তবে শেষ পর্যন্ত এতে ওয়াশিংটনের কোনো লাভ হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ দুই প্রণালিই সমন্বিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে; যা হবে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ভয়াবহ ধাক্কা।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ যদি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হয়, তাহলে বাব আল-মান্দেব তাদের বড় চাপ তৈরির শেষ কৌশল হতে পারে। পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ইরান শেষ পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত। তারা ওয়াশিংটনকে দেখাতে চাইছে, একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এতে দ্বিপক্ষীয় সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের সামুদ্রিক পথের জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হবে। তিনি বলেন, তেহরান এখন কাছাকাছি ও দূরবর্তীদুই ক্ষেত্রেই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বার্তা স্পষ্টশুধু হরমুজ নয়, বাব আল-মান্দেবও এখন ঝুঁকির মুখে।

হুতিরা এর আগেই প্রমাণ করেছে যে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত করার সক্ষমতা তাদের আছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর ইরানসমর্থিত এ গোষ্ঠী লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা শুরু করেছিল। তাদের দাবি ছিল, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিশানা করছে তারা। সব হামলার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে বিকল্প পথে চলাচল শুরু করে, ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের সরাসরি নির্দেশ ছাড়া হুতিরা বড় ধরনের পদক্ষেপ নেবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মতে, হুতিরা যদি জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আরও বড় সামরিক অভিযান চালাতে পারে। এতে পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাতের পরিধি ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়বে।